সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

বইমেলা বললেই আজও আমার মনে পড়ে যায় দেশবিদেশের ভূতের গল্প আর রূপকথার বইয়ের কথা। আর সাদা ধবধবে একটা পেন্সিলের কথা। শিষ বদলান পেন্সিল। খাপের ওপর আকাশি রঙের ইরেজার আটকান। পেন্সিলটা খুব প্রিয় ছিল আমার। এতটাই প্রিয় যে প্রাণ ধরে সেটা ব্যবহার করতেও পারিনি। বইমেলার স্মৃতি হয়ে আমার সাধের বাক্সতে সেটা আজও রয়ে গিয়েছে।

স্মৃতি হাতড়ে আর একটু সামনের দিকে চলে এলে দেখতে পাই বইমেলা মানেই ময়দানে ধুলো ওড়ার ভয়। পাওনা হত কাশি আর শ্বাসের কষ্ট। ওই আতঙ্কেই বেশ ক’বছর সশরীরে মেলায় যাইনি। বই আনতে দিতাম চেনা দাদাদের হাতে। ওরা এনেও দিত। কালো কালো মনোলোভা অক্ষরে মুখ আর মন ডুবিয়ে বসে পড়তাম আমি। বইমেলা মেলা বইয়ের অর্থ সেই হয়ত প্রথম বুঝতে শেখা।

১৯৭৬ সালে কলকাতায় বইমেলার সূচনা হয়েছিল। প্রথমে ময়দান, তারপর মিলন মেলা প্রাঙ্গণ এবং বর্তমানে বইমেলার ঠিকানা হল সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক। একের পর এক ধাপ পেরিয়ে আসতে আসতে আমাদের কলকাতা বইমেলা যে শুধু পরিণত হয়েছে তাই নয়, পেয়েছে আন্তর্জাতিক বইমেলার তকমাও। এক এক বছর এক একটি থিমে সেজে ওঠে আমাদের সাধের বইমেলা। এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের থিম রাশিয়া। এবছর একটা দিন এগিয়ে এসে মেলার উদ্বোধন হয়েছে বটে, তবে সূচনাতেই বাধ সেধেছিল বৃষ্টি। অনেক প্রকাশকের ক্ষতি হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে খুব জানতে করছে। বই আসলে কী? নির্মোহ সাহিত্য চর্চার ফল নাকি দিনের শেষে একটি প্রোডাক্ট? আমার মতে বই একটি হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তি। হ্যাঁ সম্পত্তি। আমরা যারা টুকটাক লেখালিখি করি, এবং যাঁরা ফুল টাইম লেখক অর্থাৎ লেখা ছাড়া যাঁদের আর অন্য কোন পেশা নেই তাঁদের কাছে বই থেকে আসা অর্থ অবশ্যই রোজগারের একটা উৎস।

আজকের মার্কেটিং নির্ভর যুগে দাঁড়িয়ে বইমেলার আগে একবার সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় চোখ রেখে দেখুন, আমরা সকলেই নিজেদের সময়রেখা জুড়ে বইয়ের কথা লিখছি। কেউ নিজের বইয়ের কথা বলছেন, আবার কেউবা পরিচিত এবং প্রিয় লেখকের বইয়ের স্তুতি গাইছেন। মোদ্দা কথা হল, আজকাল বই বাজারে বিক্রি হতেই আসছে। নগদ কড়ি খসিয়ে মানুষজন বই কিনছেনও কিন্তু কজন পড়ছেন সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

বইমেলা মানে মিলনের মেলাও। একথাটাও অস্বীকার করা যায় না। আজকের লেখকরা খুব সহজেই প্রকাশকের কাছে পৌঁছতে পারছেন। পাণ্ডুলিপি নিয়ে কলেজস্ট্রিট পাড়ায় প্রকাশকের দরজা দরজায় আজ আর কাউকেই ঘুরতে হয় না। ফলে স্বল্পবয়স্ক প্রকাশকদের হাত ধরেই বছর বছর নতুনদের বই বেরোচ্ছে। এর ফলে যেমন আমাদের বাংলা ভাষাটার চর্চা বাড়ছে তেমনি সাহিত্যের গুণগত মান নিয়েই একাধিক বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। তবে সব ভালোলাগা সব বিতর্কই একটি জায়গায় এসে মধুভাবনায় পরিণত হয়। সে জায়গাটি হল বইমেলা প্রাঙ্গণ। লেখক আর পাঠকের মিলনস্থল।

কেউ কেউ ছুটে আসেন মনের টানে। কেউবা আসেন প্রিয়তম লেখকের লেখা বইতে স্বাক্ষর নিতে। কেউ আসেন বুকের মধ্যে নতুন বইয়ের গন্ধ ভরে নিতে। আজকাল অনলাইনে সারাটা বছর বই বিক্রি হয়। মানুষ ঘরে বসেই মনপসন্দ বই কিনে নিতে পারেন। ঠেলাঠেলি নেই, গাড়ি ভাড়া খরচা করে কোথাও যেতে হয় না। উপরি পাওনা থাকে ছাড়। অনলাইন পোর্টালে অন্য প্রোডাক্টের মত বইকেও রেটিং দেওয়া যায়। কিন্তু তাও আমাদের মন থেকে আমাদের জীবন থেকে বইমেলার গুরুত্ব এতটুকু কমে যায়নি। বরং লেখালিখির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত মানুষগুলোর কাছে বইমেলা আজও দুর্গা পুজোর মতোই একটি বড় উৎসব। নবীন প্রবীণের এই মিলনাঙ্গনে খাবারের স্টল, হাতের কাজের ছোট্ট দোকান থাকে ঠিকই কিন্তু তাতে বোধ করি দুই মলাটে বন্দি আখরের গুরুত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না।

আচ্ছা এত ঢাকঢোল পিটিয়ে যে বইমেলা হচ্ছে, আজকের দিনে কি মানুষ সেইভাবে বই পড়ে? মানুষের কাছে এত সময় আছে আজ? আমি বলব হ্যাঁ। যাঁরা সত্যিকারের পাঠক তাঁরা আজও বই পড়েন। তাই আমি মনেপ্রাণে চুয়াল্লিশতম কলকাতা বইমেলার দীর্ঘায়ু কামনা করি। রাশি রাশি বই, অভিজ্ঞ এবং অভিজ্ঞতা আহরণে ইচ্ছুক পরিশ্রমী প্রকাশক, স্বনামধন্য লেখক, তরুণ অক্ষরকর্মী এবং গুণমুগ্ধ পাঠকদের সমাবেশে এই বইমেলা হয়ে উঠুক বছরের এমন কটি সোনালি দিন যাতে আমরা প্রত্যেকেই আরও বেশি করে এই দিনগুলোর অপেক্ষায় থাকতে পারি। আসুন না সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে কটা দিন বইমেলা যাপন করি।