সাতাশতম চিঠি

দেবাঞ্জনা মুখার্জি ভৌমিক

বারোটা মাসে সাত সুরে বাঁধা বারোটা গানের আবহ সঙ্গীতের মূর্ছনায়, বাহান্নটা সপ্তাহে বাহান্নটা রঙে রঙিন চালচিত্র সাজিয়ে চলে গেল একটা বছর। আবার অনেক কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অনেক দ্বন্দ্ব কেটে যাওয়ার আশা, অনেক ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাওয়ার ইচ্ছা, অনেক দুঃখ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আরও তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের আবির্ভাব- সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েক হাজার কোটি কোটি মানুষের জীবনে। মঙ্গল গ্রহে মানুষ নেই, পৃথিবীতে আছে। আর মানুষ থাকলেই আছে দুঃখ আছে মৃত্যু। তবু সব ঋণাত্মক চিন্তা থেকে নিজেদের মস্তিষ্ককে শত হস্ত দূরে সরিয়ে রেখে নতুন বছরকে নতুন করে আমন্ত্রণ জানানো নিজেদের জীবনে।

নিজের বাড়ি নিজের শহর থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে বার্কশায়ারের মেইডেনহেডের এই চার মাথার মোড়ে কাটাকুটি খেলা রাস্তার পাশের এক এপার্টমেন্টে কেটে গেল দুই হাজার সতেরো সালের দিনগুলো। অনেক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন, অনেক নুতন মুহূর্তের যোগফলে ভরে উঠল এ জীবনের আরও একটা বছর। কোনও কোনও দিন কেটে গেল বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে চূড়ান্ত রোমান্টিকতায়। আবার কোনও কোনও দিন সেই বৃষ্টির বেগই এত বেশি হল যে সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার ওপরই! কোনও মাসে ঝড়ো হাওয়াতে ছাতা ভেঙে বাড়ি ফেরা আর কোনও মাসে প্রবল গরমে ফ্যানহীন ঘরের দরজা খুলে একটু প্রাকৃতিক হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার ইচ্ছে, মনের কোণে আশা- আজ উঠুক ঝড়, উড়ে যাক আমার ঘরের পর্দাগুলো।

এই তো জীবন। কখনও একটা কিছুকে খুব ভালোলাগা, আবার সেই একই জিনিস ক’দিন পরই সমস্ত মন্দ লাগায় পরিপূর্ণ। আসলে সময় বিশেষে বদলে যায় সব কিছু। দেখার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টাতে থাকে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। জীবনের খাতায় নতুন একটা বছর মানেই তাই জীবনকে নতুন করে পাওয়া ঘরের দেওয়ালে নতুন ক্যালেন্ডারের নতুন দিনগুলোয়। এক একটা নতুন বছরের প্রথম দিনটায় জীবনের যাবতীয় দুঃখ কষ্টকে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র এটুকু ভেবেই আনন্দে ডুবে যাওয়া যায় যে, হ্যাঁ আরও একটা বছরের প্রথম দিনের সূর্যের আলো আমার গায়েও এসে পড়েছে, আমি এখনও জীবিত। আমি এখনও কোনও উগ্রপন্থীর অস্থির উন্মাদের মতো আক্রমণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়িনি। কিংবা শরীরের কোনও অভ্যন্তরীণ জটিলতায় যমরাজের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হতে হয়নি। অথবা জন্মদিন উপলক্ষে কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়নি আমার এ ভবলীলা। অথবা নিজের বা অন্যের ভুলে পথে ঘাটে পা ফেলে হাঁটার সময় দুর্ঘটনায় নিহত হইনি।

আর তাই উপহার স্বরূপ আজকের দিনটা সূর্য ওঠার পর থেকে অস্ত যাওয়া অবধি আস্ত দিনটা আমারই, পুরোনো দিনের অভিজ্ঞতায় বৃদ্ধ হয়ে আগামী দিনগুলোর মধ্যে সব শুভ হওয়ার আশায় বিশ্বাস রাখা। মান আর হুঁশ শব্দের প্রকৃত যথার্থতায় সৌরজগতের আপামর জনজীবনে শুভবোধের আলো ছড়িয়ে পড়ুক। ২০১৮ নিয়ে আসুক আঠারো বছরের উদ্যম আর সৎ সাহস, সারাপৃথিবী জুড়ে।

(চলবে)