story2

“… the war is only a publicity agent which makes every one know what has happened, yes, it is that.” PICASSO by Gertrude Stein.
(বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ শ্রী রুদ্রদীপ মজুমদার)

রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
রাজর্ষি দাশ ভৌমিক

একটা গল্প কখন , কবে আর কিভাবে শুরু হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। গল্পের ঠিক মাঝখানে বসেও বলা যায় না যে ততক্ষণে গল্পটা চলতে শুরু করে দিয়েছে।যেন ভাঙাচোরা লিপি সিনেমাহলের ব্যালকনির টিকিট সস্তায় কেনা হয়েছে, ব্যালকনির সাউন্ড খারাপ হওয়ায় সার্কেলের থেকে ব্যালকনির টিকিটের দাম কম, আর পরিচালক-ক্যামেরামান শুদ্ধু গোটা ইউনিটটাই আধোঅন্ধকার লিপি সিনেমার ভিতরেই করবি-তো-কর শুটিং করছে।জানতেও পারা গেল না, বহুকাল পরে আবার বিড়ির দোকানের মালিক বাদশাকে সঙ্গে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে পর্দায় নিজের মুখ দেখে থঃ হয়ে যাওয়া।তবু হিরো হতে পারা গেল না।

ততদিনে কিন্তু উত্তমদাকে চেনা হয়ে গেছে।পেশায় ছেলেদের হস্টেলের মশালচি।সাতসকালে ফিটফাট জামাপ্যান্ট পরে চলে আসে।ইস্তিরি করা জামা, রিফু করা প্যান্ট।বোতামের দুপাশে ভাঁজের দুটো দাগ দেখা যায়, জল মেরে পেতে আঁচরানো চুল।হস্টেলে ঢুকেই সাইকেল সাইড করে, জামাকাপড় ছেড়ে , কলঘর থেকে গামছা আর ছেঁড়া স্যান্ডোগেঞ্জি গায়ে উত্তমদা বেরিয়ে আসে।বাটনাবাটা শিলের উপর জলের ছিটে দিয়ে আড়াআড়ি ঘষে ময়লা পরিষ্কার করে।বটঠাকুর বাতাসের মধ্যে দুপুরের মেনুটা ভাসিয়ে দেয়।কাতলার কালিয়া শুনলেই গ্লাসে করে আস্ত জিরে ঢেলে ফ্যালে, দই-রুই শুনলে গোটা পাঁচেক আদা হামানদিস্তায় থেতো করে।গলায় গুনগুন সুর ভাজতে ভাজতে ছ-ফুট উচ্চতায় থাকা চোখের দৃষ্টিটা ছেলে-হস্টেলের মেসের আর পাঁচটা কর্মচারির ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে গলে রান্নাঘরের উনান এর জায়গায় পড়ে।

-হ্যাঁ রে , অশোক, মাছে ডিম হয়নি?
অশোক ডেপুটি, পঁচিশ বছরেই নাদাভুরি, মাছভাজার অম্বলগন্ধে চান করে খেতে বসতে পারে না, উত্তর করে-তিন তিন ভাগ করে সরানো আছে।
অশোকের কথার শেষটুকু ছূঁচালো জিভের মধ্যে হারিয়ে যায়। রান্নাঘরে সিগারেটের আগুন চাইতে বোর্ডাররা যখন তখন চলে আসে।উত্তমদা , তার রোগা-কালো-মাথাপাতা চুলের চেহারা নিয়ে আবার গানের মধ্যে ফিরে যায়।

বটঠাকুরের নাম ছেলেরা দিয়েছে-শারুখ খান।ব্যাচের পর ব্যাচ বটঠাকুরকে এই নামেই চেনে।বটঠাকুরের খুব-ধারনা মুখের শ্বেতির কারণের এই নাম হয়েছে।ফলে, নামটা কানে গেলেই বটঠাকুর তেলে পড়া সদ্য ফোড়নের মতই জ্বলে ওঠে।খুন্তিথালা ফেলে ছোটে সুপারের কাছে নালিশ ঠুকতে। এইবাজারে, অন্যহোস্টেল থেকে ঠাকুর ভাঙিয়ে আনা কত কঠিন বুঝে সুপার শারুখকে বুঝিয়েসুঝিয়ে হস্টেলে ফেরত পাঠিয়ে দেন।ততক্ষণে বেলা গড়াতে শুরু করেছে, গাছের ছায়ারা লম্বা হচ্ছে।সেকেন্ড হাফের ক্লাস শুরু হবে।অশোক-উত্তমদা মিলে ডাল আর কাতলা মাছ ভাজা দিয়ে দুপুরটা ম্যানেজ করে দিয়েছে। বটঠাকুর এসে বাটনাচাপা দেওয়া অল্প ধনে পাতা দিয়ে মেখে রাখা মাছের ডিমের হিস্‌সা চটের থলেতে পুরে কোয়াটারের দিকে হাঁটা দিয়েছে।গরমের দুপুর, সারাসকালের খাটাখাটনিতে ক্লান্ত উত্তমদা, চানঘরে ফিরে দুবালতি জল ঢালে।হেঁসেল থেকে নিয়ে আসা সরষের তেল মাথায় ভালো করে ঘষতে ঘষতে মনে করে এককালের বাবরিচুলের কথা।কালো, ইস্পাতের মত বুকে লিরিল সাবান ডলে।রান্নাঘরের কর্মচারিদের জন্য মাসে দুইখানি সাবান বরাদ্দ।হাইজিন হাইজিন করে সুপার খুব চেঁচান আর পোড়া সিগারেট গেট এর মুখে ফেলে মারুতি অল্টো চরে কোয়াটারে ফেরেন। নিচে নামতে নামতে উত্তমদা ছোট্ট, রোগা মাইক্রোফোনটা খুঁজে পায়।–হ্যালো, টেস্টিং, টেস্টিং।

দুর্গাপুজার আটদিন, ট্রেনে-বাসে করে গঞ্জে মফঃস্বলে ঘুরে বেড়ানো, ব্র্যাকপ্রেশ চুল, যতখানি বশে রাখা যায়,লম্বা ঘেরের প্যান্ট, উঁচু কলারের জামা।কোথাও না কোথাও আর্টিস্ট ক্যানসেল হয়ই, খোঁজ করতে করতে সেখানে পৌঁছে যাওয়া।সস্তার হোটেল, প্যাকেটের মাল, খেপ খেটতে আসা মেয়েছেলে, তাদের গায়ে সেন্ট আর বিড়ির কড়া গন্ধ, সিঙেমাছের ঝোল, একপিস লেবু, দুপুরে গড়িয়ে নেওয়া আর শরতের আকাশ।কেন তুমি চুপি চুপি, আমার মন নিয়ে যাও।বলেও বলো না কিছু বলে, হে এ এ এ, হে হে হে, দেখা দিয়ে যাও দূরে দূরে সরে সরে।ফিরতিলোকালে গাইতে গাইতে বিজয়া-দশমী কাটিয়ে ঘরে ফেরা।

পাশের বাথরুমে জলের শব্দে গ্রীষ্মের দুপুরে ফিরে আসে উত্তমদা।আন্দাজে বলে-ম্যানেজারবাবু নাকি?
উত্তর আসে-হ্যাঁ, উত্তম?
ম্যানেজারকে একলা পাওয়া গ্যাছে কলঘরে।ভেজাচুলে দরজার উপর দিয়ে তাকিয়ে উত্তমদা চারদিকটা একবার বুঝে নেয়, কেউ নেই।ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে-খাওয়া হয়ে গেছে?
ম্যানেজার মুখ ঝামটা দেয়-কালিয়া হওয়ার কথা ছিল না?মৌরিও পেলাম না।কাল রাত্রেই তো অর্ডার করেছিলাম।
-আর বলেন কেন!বটঠাকুর সকাল সকাল কি ছুতো করে হাওয়া। সব মাথায় ওঠার জোগাড়। আমি অশোককে বললাম তুই মাছভাজাটা ধর আমি ডালটা দেখছি।এভাবে আর কতদিন চলবে!অশোক ভালো ছেলে…আমি বলছিলাম কি…
এটুকু বলে উত্তমদা কানখাড়া করে, ওদিক থেকে সাড়াশব্দ নেই, জল ঝরে পড়ছে অবিরল।ম্যানেজারের মন বুঝতে পেরে উত্তমদা লিরিলসাবান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে।কলঘর থেকে বেড়িয়ে দ্যাখে ম্যানেজার মুখ ধুচ্ছে, বললো-আজ্ঞে, একটা কথা ছিল।
-বলো
-একটা মিকচার গাইন্ডার হলে বড় ভালো হত, হস্টেল নাইনে এসেছে, ফাইন পেস্ট হচ্ছে।
-তোমাকে ছুটি দিয়ে মিক্সার আনাই?
-সে আপনার মর্জি।তবে কিনা, মেশিন চালাতেও মানুষ লাগে, আমার হাত তাড়াতাড়ি ফাঁকা হলে আমি অশোককে অনেকটা হেল্প করে দেব।বটঠাকুর তো খরচের খাতায়।
ম্যানেজারের মনে কথাগুলো ধরলো।কালিয়ার ক্ষতটা তখন দগদগে।উত্তমদাকে ‘দেখছি’বলেসাইকেলনিয়েবেরিয়েগেল।উত্তমদাচানটানকরেখেতেবসে।আমি দেখেছিলাম, কানাউঁচু স্টিলের থালায় উত্তমদা যেটুকু ভাত নেয়, সেটুকু খাবার সুদূর পুরুলিয়া থেকে হাওড়ার হোস্টেলে আসা প্যাকাটে ছেলেরাও খাবে না।তার উপর ডাল দিলে, ডালের জল ভাতকে হলুদ না করেই থালার চারিদিকে ছড়িয়ে যায়।
উত্তমদা জিভ কেটে বলে-যাঃ লঙ্কাটা নিয়ে বসতে ভুলে গেছি, আবার মিশচেফ খুলতে হবে।
খাবার ঘরে সেসময় আর কেউ নেই, খানিকটা চক্ষুলজ্জা আর বাকিটা সঙ্গলাভের জন্য বসেছিলাম উত্তমদার মুখোমুখি, টেবিলের ওপাশে।
বললাম-আমার জন্যেও একখানা এনো তাহলে।
বেঞ্চের উপরে হাঁটু তুলে বসেছিল, পা নামিয়ে চটিতে গলিয়ে বলল-নিয়েই আসি তাহলে দুখানা লঙ্কা, নুন লাগবে নাকি?
লঙ্কানুনের বাঁধুনি দিয়ে ডালভাতকে ধরে রাখতে রাখতে উত্তমদা জানতে চেয়েছিল-দুপুরে ক্লাস নেই নাকি?
-ছিল, যাইনি।এই রোদের মধ্যে হস্টেল থেকে কলেজ, এতখানি পথ!
হস্টেলের চারিদিকে তখন সবুজ চ্যাটচ্যাটে গরম। মিশচেফে রাবারের মত শক্ত কাতলার ঘাড়ের-কাছের পিস।জালির বাইরে মাছি ভনভন করছে।খা-খা করছে একটা গোটা হস্টেল-বাড়ি।বন্ধ কাঁচদরজার ওপারে বিস্কুটের বয়াম, বিছানার উপর টেক্সটবুক, আনন্দলোক খুলে রাখা।জঙধরা লোহার সিন্দুকের পিছনে চার্মসের লুকানো প্যাকেট। কেঁচে, মেলে-রাখা জাঙিয়ার জল বারান্দায় ঝরছে।তৃষ্ণার্ত চড়াই এসে সেই জল চেটে যায়।ধুকধুকে বুকের কাগজকুড়ানির দল পাঁচিলের ফোকর গলে ঢুকে পরে গাঠিকচুর শিঁকড়েরসন্ধান পেয়ে যায়।story1

এমন দুপুরে উত্তমদা আমাকে প্রস্তাব দিল-আমার সাইকেলখানা জলের দরে বেচব, নেবেন? একদম নতুন সাইকেল।সাইকেলটা থাকলে রোদ মাথায় নিয়ে কলেজে যাবার ঝক্কি থাকবে না।হেব্বি জিনিস।

কলেজ, সাইকেল থাকলেও আমি যাব না।বিকেল হওয়ার আগেই একটা ক্রিকেট ম্যাচের কথা আছে।আমি যে জীবনের মধ্যে সে-বয়সে ডুবে ছিলাম সেখানে না-বোলিং করতে হয় না ফিল্ডিং।আম্পারিং তো বোকারা করে।কেউ বললে,ব্যাটিং। উইকেটকিপারের পিছনে যেন আদিগন্ত বিস্তৃত খড়ের গাদা, সেখানে চিতটি হয়ে শুয়ে ঘাসের ডগা দাঁতে কেটে রস আস্বাদন করতে করতে অলস বিকেলে বাকিদের খেলতে দেখার নেশায় পড়ে গেছিলাম।কিপারের হাত গলে বল গড়িয়ে গেলেও আমার আয়াস ছেড়ে উঠতাম না।
অথচ সাইকেলের অন্য গুরুত্ব আছে।আমার তাই উত্তমদাকে মানা করে দিতে অনিচ্ছে হয়।

খাবারটেবিলে বসে জিজ্ঞেস করি-সাইকেলটার কলকব্জা সব ঠিক আছে তো? দাম কত চাইছো?
-দাম দিয়ে দেবেন খনে, আড়াইশ টাকা।আর নতুন সিট লাগিয়েছি, চাকায় ফুল দিয়েছি, সেসব ধরে আর পঞ্চাশ টাকা, কুলে তিনশো।
ভাতের গরাস মুখেই থেমে যায়।তিনশো টাকায় সাইকেল, সেই বাজারেও!ভাগ্যিস দুপুরবেলা কলেজটা ফাঁকি দিয়েছিলাম।চোরাই মাল না হলে তিনশো-টাকায় সাইকেল বোকারাই ছাড়বে।
জানতে চাই-সাইকেলের হিস্ট্রিটা ঠিকঠাক তো?মানে, তোমারি-তো?
উত্তমদা হাসে।হলুদ বড়, দাঁত।ডালমাখা ভাত লেগে আছে দাঁতে।–হকের সাইকেল দাদাবাবু।আসলে এ সাইকেল ছিল হোস্টেল আঠারোর বটঠাকুরের।সে হার্ট অ্যাটাকে মরলো এই জানুয়ারিতে।আঠারোর বটঠাকুরের কিছু ধার ছিল সতেরোরের বটঠাকুরের কাছে, মৃতমানুষ আর কি ধার শোধ দেবে , তাই বটঠাকুরের বেধবা বউ সব ধার মিটাতে সাইকেলটা দিয়েছিল সতেরোর বটঠাকুরকে।তার আগেপরেই বটঠাকুরের ধরা পড়লো কোলেস্টেরল।সকাল বিকেলে হাঁটার নিদেন দিলে ডাক্তার।সাইকেল চড়াও বারন।আমি জলের দরেই তাই কিনেছিলাম।এদিকে আমার কি কেস! গেলমাসে বুড়োআঙুলের উপর হামানদিস্তা পড়ে হাড়-এ ফাটল ধরেছে।অপারেশান না করালে নাকি ঠিক হবে না! সামনে পুজোর সিজিন, খোঁড়াচ্ছি বোঝনি?স্টেজ এ এভাবে উঠলে পাব্লিক প্যাদাবে… লোকের অপকার করি এই বদনাম নেই, স্লাইট অপয়া তো আছেই এই সাইকেলটা।পরে কেউ পাছে আপনাকে কানভাঙানি দেয় তাই আগে থাকতেই বলে দিলাম।আপনারা তো নকশাল করেন, এসব মানেন নাকি!
সাইকেলটা নিয়ে নিলাম, ঘরে বিশেষ টাকা ছিল না।বিকেলের দিকে মিটিয়ে দেব বললাম।
উত্তমদা একগাল হেসে বললো-টাকার চিন্তা করবেন না, আপনি রাখুন, প্যান্টের পকেট হা্তড়ে রিংশুদ্ধু চাবি আমাকে দিয়ে দিলো।খাচ্ছিলাম, তাই বাহাতে নিলাম।গোল রিং, খবরের কাগজ থেকে কেটে তাতে কিশোরকুমারের ছবি বসানো।
–রিংটা পছন্দ না হলে আমাকে ফেরত দিয়ে দিয়েন।বলে মেসরুমের এককোনে ঝোলানো তোয়ালেতে হাতমুখমুছে হাঁটা দিল।চেহারাটা লম্বা, তবু মনে হলো, খোঁড়াচ্ছে।

সেদিন বিকেলেই সাইকেল নিয়ে গোপালের ঠেক, অতিসস্তার ইম্পিরিয়াল ব্লু, এক পুরিয়া গাঁজা, সেকেন্ড গেট থেকে সিগারেট আর চালবাদাম ভাজা।শালিমারের দিকে গিয়ে এটিএম থেকে টাকাও তুললাম।বৃষ্টি পড়লো ঝিরিঝিরি।বাসে, পায়ে হেঁটে নেশার জোগানে ঘুরতে হবে না ভেবে ভিজলাম।বুনো নিজের ঘরে গিটার নিয়ে বসেছিল।ক্লাস করে এসে ঘুমিয়েছে।চোখমুখ ফোলা।সন্ধের গোড়ায় আমার হাতে একব্যাগ জিনিস দেখে আন্দাজ করলো।সচরাচর এসব জোগাড় করতে ন-টা দশটা বেজে যায়।ঘুমের ঘোর আর ক্লাসের চাপ আর গানের ডাক-তাবলে কি নেশা থেমে থাকে! বিছানার উপর কাগজ পাতা হলো।দক্ষিন ভারতে কলাপাতার উপর যেমন নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট পদ পরিবেশিত হওয়ার রেয়াজ আছে তেমনি দৈনিক বর্তমানের এককোনে চালবাদামভাজ, ইম্পিরিয়াল ব্লু দিয়ে চাপা দেওয়া, দু তিনতে প্লাস্টিকের কাপ, এক প্যাকেট চার্মস, দেশলাই, আরেককোনে পুরিয়া, সাফি, ছোট্ট কলকে।

বিকেলে এসে কি কাজের চাপ পড়বে ভাবতে ভাবতে হস্টেলে ঢুকে উত্তমদা দেখলো-দুপুরে ঘুমিয়ে বটঠাকুরের মাথা ঠান্ডা হয়েছে।সয়াবিনের তরকারি হবে।অশোক আলু কুটছে।শারুখ খান ম্যানেজারের সঙ্গে শলা করতে ব্যস্ত।উত্তমদা একদলা জিরে হামানদিস্তায় নিয়ে, থেতো করে রাখা আদা আর রসুন লঙ্কা ফেলে কাজের অছিলায়রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।অশোক আর বটঠাকুরের চোখাচুখি হল একবার।
বটঠাকুর ম্যানেজারকে নালিশ করলো-এই উত্তমতা বড় গাঁজাখোর হয়েছে।একে ট্রারেনস্ফার না করলেই চলচে না।
পরনেরগামছায় লুকিয়ে রাখা বিড়ি ধরাতে গিয়েও কি মনে পড়ায় উত্তমদা বিড়ি আবার যথাস্থানে রেখে হুড়হাড় করে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে এলো।এদিক ওদিক জিজ্ঞেস করে পৌঁছে গেল বুনোর ঘরে।হস্টেলের স্টাফরা ছেলেদের ঘরে অনুমতি না নিয়ে ঢোকে না।উত্তমদা চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রইলো।
বুনো কোলের উপর থেকে গিটার সরিয়ে বললো- কি ব্যাপার?
উত্তমদা বুনোর থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো-ইয়ে দাদাবাবুর সঙ্গে দরকার ছিল।
আমি টাকাটা তুলেওছিলাম এটিএম থেকে কিন্তুপরে ক্যান্টিনের ধার মেটাতে গিয়ে অনেকখানি খসে গছে, যেটুকু আছে সেটুকুও উত্তমদাকে দিয়ে দিলে মাস আর চলবে না।ক্যান্টিনে বিকেলে ডিমসেদ্ধ আর চা জুটবে না।বিড়ির দোকানের বাদশার হাতে প্রতি সপ্তাহেই অল্প কিছু টাকা দিয়ে ধার মেটাই।কলেজ স্ট্রিটে গেলে পুরানো বইপত্তর কিনি।মাসে একবার বাসভাড়া-ট্রেনভাড়া গুনে গেঁথে নিয়ে বাড়ি ফিরি।কোনদিন ট্রেন ফেল করলে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।শনিবার দুপুরে লোকাল ফেল মারে না, এই ভরসা।
-উত্তমদা, ভিতরে এস।
ঘরের ভিতর ঢুকে উত্তমদার চোখ সরে গেল খাটের উপর।সেখানে ইম্পিরিয়াল ব্লু, চালবাদাম ভাজা।যেহেতু টাকা নেই তাই অবস্থা সামাল দিতে বললাম-চলবে নাকি একটু?
উত্তমদা সেই অতিপরিচিত হাসি দিয়ে বললো-বিদেশি তো, তা দাও অল্প করে, ডিউটির সময়…!
বুনো অনিচ্ছেয় খাটের জায়গা ছেড়ে সরে বসলো।উত্তমদা খাটে না বসে জানালার কাঠের উপর হেলান দিয়ে দাঁড়ালো, বললো-সেভেন আপ লাগবে না।অল্প জল নেব।
উত্তমদাকে পেগ বানিয়ে দিলাম।গাঁজার পুরিয়ার দিকে জুলজুল চোখে চেয়ে বললো-বাবার প্রসাদ বানাই, চলুন।
আমার মাথায় তিনশো তাকার ধার।পনেরো টাকার পুরিয়া এগিয়ে দিলাম।উত্তমদা কাঁচি দিয়ে মিহি করে কেটে তাতে সিগারেটের তামাক ঢেলে, মিশিয়ে মশলা বানালো।গাঁজার কলকে উলটো করে ঝেরে পরিষ্কার করলো।ছাই-কালি হাতে কুড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ফেললো।কলকের মধ্যে সাফি গুটিয়ে মশলা পুরে আমার সামনে ধরে বললো- আগুন তোলেন, আমি দেশলাই দিচ্ছি।
হাতবদল করে কলকে শেষে পৌছল উত্তমদার কাছে।দুটান দিয়ে , কিছুক্ষণ ঢুলুঢুলু থেকে বুনোকে বললো-সি-স্কেলটা একটু ধরুন তো!
আমি আর বুনো গান বাঁধি।প্রান্তিক পশ্চিমবঙ্গের দুইদিক থেকে আমরা দুজনে কলেজে পড়তে এসেছি।এই সেদিনও বুনো বাঁকুড়ার লালমাটির পথে আর আমি দক্ষিণ ২৪ পরগনার নিচুজমি পেরিয়ে স্কুলে যেতাম।দুজনের এ-জীবনে দেখাই হত না যদি না এই হস্টেল থাকতো, জীবনে বান্ধবী থাকতো, পড়াশুনা করার ইচ্ছে থাকতো বা নেশা করার ইচ্ছে না থাকতো।বুনোর নাম কেন বুনো হল আমি জানিনা, অবশ্যই কলেজের খাতায় রায়-গাঙ্গুলি-দাশ-সেন টাইপের একটা ভালো নাম আছে।বুনোকে জিজ্ঞেস করলে বুনো ব্যাচের মাতব্বরদের দেখিয়ে দেয়।সেইসব মাতব্বরদের ধরলে তারা বলে-বন থেকে এসেছে তাই বুনো।একটা সময় পর আমি বুনোর নামকরনের উৎস খোঁজায় হাল ছেড়ে দিয়েছি।

লেবুর ঘর ছিল তাসের আখড়া। উনত্রিশের চালে সুর্য উঠতো, সন্ধে ঢলে আসতো।তাস কখনও প্যাকেটে সেঁধিয়ে যেত না।খাটের একপাশ দিয়ে তাসের-হাতের উপর লেবু ঘুমে ঢলে পড়তো, বাকিরা খেলে যেত।এক পার্টনার উঠে গেলে আরেকজন এসে তার জায়গা নিয়ে নিত।দুতিনটে বেওয়ারিশ খাটিয়া ছিলঘরটায়, তাসুড়েরা এসে সুযোগ পাবার আগে জিরোবার জন্য।লেবুর রুমে একবার ঢুকে দেখি পার্টনার ফাঁকা নেই, খাটিয়ায় বসে আছি, দেখি খাটিয়ার উপর দুতিনটে লিটল ম্যাগাজিন পড়ে আছে। লেবু তাস খেলছিল।
ওকে জিজ্ঞেস করলাম-ম্যাগাজিনগুলো কার?
লেবু বললো, ওর না!না হওয়াটাই স্বাভাবিক, এই হস্টেলে মদের বোতল, সিগারেটের ফয়েল, পাঁচমুখো কলকে, ড্রেনড্রাইটের ফাঁকা টিউব সবই দেখা সম্ভব-কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন দেখতে পাওয়া অবিশ্বাস্য।হাত ফেলে দিতে দিতে লেবু বলেছিল-মিমি এই ঘরে এসে পড়াশুনা করে, ওরই হবে।
মিমিটা কে? এ তো মেয়েদের নাম।লেবু বললো-মেকানিক্যালের ছেলে, পরিচয় করিয়ে দেব।
পরিচয় হওয়ার পর মিমি বললো-আমাকে আর মিমি বলবি না, আমার নাম এখন বুনো। মিমি আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের নাম ছিল।
বুনোর সঙ্গে অল্পদিনের মধ্যেই আলাপ জমে গেল।রোগাসোগা, লম্বা চুল, পড়াশুনায় আর বিশেষ মতি নেই।লিটল ম্যাগাজিনেরও পাঠক নয়, এক্স গার্লফ্রেন্ডটির শখ ছিল সেসব। আসলে গান গায়, গিটার বাজায়, উকুলেলে বাজাতে পারে, একতারাও বাজিয়ে দেয়।মায়ের হারমোনিয়াম বাবার কাঁধে চাপিয়ে হস্টেলে নিয়ে এসেছে।এর তার গান তোলে।কোনদিন স্টেজে বাজায়নি, গায়নি, ছোটবেলা থেকে গান শেখেনি কিন্তু দাদুর কীর্তনীয়া হিসেবে নাম ছিল বেশ।
এর পর আমাদের জীবনও বেশ বদলে গেল। আমরা একসঙ্গে গানবাজনা করা শুরু করলাম। একসঙ্গে নেশা করাও শুরু করলাম।ছাদের আড্ডায়, মাঠের ঠেকে গাইতে হলে বুনো পিঙ্ক ফ্লয়েড গায়, লালনের গান গায়, রবীন্দ্রসঙ্গীতও গিটারে গায়। আর লুকিয়ে নিজেদের গান তৈরি করি।আমি লিখি, বুনো সুর বসায়, গান গায়।শনিবার বাড়ি ফিরবো বলে ব্যাগট্যাগ গুচ্ছাচ্ছি, বুনো এসে সুর শুনিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দ্যায়।বাড়ি যাওয়া চুলোয় ওঠে।বুনোর সঙ্গে গান বাঁধতে বসে যাই।এই কলেজের মাঠে বসে একসময় রঞ্জনপ্রসাদ, কখনো মহীনের ঘোড়ারা, অরুন দাস-এখন আমি আর বুনো।আমাদের ঘাড়ের উপর লেগাসির পাহাড় জমতে দেখি।বুনোর ঘাড়ের কাছে যেখানে এসে ওর লম্বা চুল পাতলা হতে শুরু করেছে সেখানে মাঝেমধ্যে মোক্ষম ব্যাথা ওঠে, কোলে মার্কেটের রাধিকাডাক্তার বলেছে-স্পন্ডিলাইটিস ডেভেলপ হচ্ছে।গিটার বাজানোটা ছাড়তে হবে।
বুনো আমাকে বলে-স্টুডিও সেটআপটা একবার বানিয়ে নিই, তারপরেই গিটারটা ছেড়ে দেব।সিন্থেসাইজার বাজাবো।
এতদিন যে চর্চা চলছিল লুকিয়ে, তা জানাজানি হতে থাকে, একটিদুটি শ্রোতা-ভক্ত জুটতে থাকে।তারা প্রশংসা করে, উপদেশ দেয়, ছুটির দিনে গোবরডাঙ্গার দিকে ঘোরাতে নিয়ে যায়।কেউ বলে লেখা ভালো, সুর একঘেয়ে; তো কেউ বলে সুর ভালো, লেখা চোতা।কানে আসে-শিগগিরই বুনোকে স্টেজে তোলা হবে।আরো দশজন জানবে বুনোর নাম।হস্টেলের দুর্নাম-এখানে শুধুই নেশাই হয়। মানুষের সেই ভুল ভাঙবে।দরজা বন্ধ করে আমরা আর গান বাজনার চর্চা করতে পারি না।কেউ না কেউ এসে পরে, গান শুনতে চায়।বুনো ভাবতে শুরু করে-গানবাজনা করেই জীবনটা কাটাবে।মেকানিকাল এঞ্জিনিয়ারিং ত্যাগ করবে। ফ্লুইড ডয়ানামিক্স, থিয়োরি অফ মেশিনস, থার্মোডায়নামিক্স, ইন্সট্রুমেনশটেশানের বইগুলোঝিলের জলে নিক্ষেপ করে ডিগ্রিটা নিয়ে বেড়িয়ে যাবে।আমি ততদূর ভাবতে পারি না, গানলেখকের দুনিয়া নির্মম-কঠিন।গায়কদের ফ্যানক্লাব তৈরি হয়, সিডি ক্যাসেট, রয়াল্টি।গান লিখে কজন গুলজার! তাই পার্ট টাইমে গান লেখক, ফুলটাইম এঞ্জিনিয়ার, হাফহার্টেড-অভিমানী।

তখনই, জীবন পাল্টাবে এইরকম একটা ধারনা আমাদের মধ্যে ঢুকে গ্যাছে।গান বাঁধতে বসলে আশেপাশের কারুর কথা আমরা আর শুনি না, কেউ বোঝাতে চায় এই জায়গাটা যেন সাইমন-গারফাংকেলের মত, কেউ বলে কথাগুলো এলানো, কেউ বলে না-সি-স্কেলটা ধরো, উত্তমদা বললো।

বুনো আগুপিছু না ভেবে সি-স্কেলটা ধরেই ফেললো।
আর উত্তমদা ধরলো-এপারে থাকবো আমি, তুমি রইবে ওপারে, শুধু আমার দুচোখ ভরে, দেখবো তোমারে।
গাঁজায় গলা শুকিয়েছে, গিটার বাজছে ঝনঝন, এলোমেলো, কিশোরকুমারের সুরেলা আবেশের সামান্যই ফুটে উঠছে তবু এটুকু দিব্যি বোঝা যাচ্ছে উত্তমদা কেবলমাত্র নেশা করে গাইছে না।উত্তমদার গলায় সুর রয়েছে, কায়দা রয়েছে, দুটো লোককে মোহাবিষ্ট করে রাখার ক্ষমতা রয়েছে।গান শেষ হওয়া মাত্র এক ঝটকায় বুনো গিটারটা দূরে সরিয়ে বলেছিল-তুমি তো জলসার সিঙ্গার পুরো।উত্তমদা সেই পরিচিত একগাল না হেসে এইবার হো হো করেই হেসে ফেলল।
-ঠিক বলেছেন বুনোবাবু।মাচায় গাইতাম যে আমি।কিশোরকন্ঠী উত্তম।
বুনো মুখ বেঁকিয়ে বললো-আর কজন কিশোরকন্ঠী হবে বলতো! গিজগিজ করছে।
উত্তমদা বললো-যতদিন গলায় সুর আর পেটে দায় থাকবে ততদিন হবে আর কি!সচিন তেন্ডুলকার , সচিন তেন্ডুলকারের মত খেলে একশো রান করে আর হরভজন সিং সচিনের মত খেলেও যদি কুড়িটা রান করে, সে রানও দলের জন্য ফেলনা না।

-ওসব ভারি কথা রাখো।নেশা চটকে যাবে, আরেকটা বরং কিশোর হোক।আমি বললাম।
বুনোও তাল মেলালো-আমাদের হাতের সামনে এরকম একজন পারফর্মার ছিল জানাই ছিল না, কি বল? হয়ে যাক আরেকখানা।
উত্তমদা গম্ভীর চোখেমুখে, চোখ অল্প লাল হয়েছে-বললো-দ্যাখো দাদাবাবুরা, স্টেজে উঠে তো আর গাইলাম, পয়সা বুঝলাম আর নেমে গেলাম, এই তো সব নয়!অডিয়েন্সের চোখে চোখ রাখতে হয় বাঘের বাচ্চার মত।আমার গুরুদেবস্টেজে উঠে ডিগবাজিও খেতে পারতেন।এই খোঁড়া পায়ে ডিগবাজি খাওয়া আমার দ্বারা আর হবে না।আর আগে, প্রোগাম করতাম, পাড়াগাঁয়ে, মাচাতে, সেখানে এক ডিগবাজি খেলেও মাচা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে।তাই কথা বলতে হয়, গানের মাঝে কথা কইতে হয়।আর যেমন অডিয়েন্স তেমন কথা।রসের অডিয়েন্স হলে রসের কথা।তোমরা দুজন লেখাপড়া শেখা মানুষ, তাই সিরিয়াস কথা।আর কথা শেষ হলেই-একটানেতে যেমন তেমন, দুটানেতে রাজা-উত্তমদা গান ধরে ফেললো।
এবার আর বুনোর গিটারের অপেক্ষা করে না।উত্তমদার গলা কিশোরকুমারের তুলনায় অনেক চাপা, নিয়মিত ধোঁয়ার কারনে গলা ফ্যাসফ্যাসে হতে শুরু করেছে।তালও কাটছে কয়েকবার, সেইটা আরো ভালো বোঝা গেল যখন বুনো গিটারটা কোলের উপর থেকে সরিয়ে হাতে ঝুনঝুনি তুলে নিল।
তাল কাটছে বুঝতে পেরে উত্তমদা গান থামিয়ে বললো-এই হল জলসা শুরু করার গান। প্রথমেই টেম্পো একদম চড়ে গেল।এরপর নানা মুডের দশখানি গান।লাস্টে চিরদিনই তুমি যে আমার, বুম্বাদার জীবনের, হ্যাঁ, কি বলে, একটা মাইলস্টোন, দিয়ে , অডিয়েন্স কে প্রনাম করে দেনাপাওনা, বিরিয়ানির প্যাকেট বুঝে কেটে পড়া।গলাটা শুকুচ্ছে, মিষ্টি আছে?
বুনো এক্লের্য়াস দিল।
–আরেকরাউন্ড হবে নাকি? বলেই উত্তমদা বললো-আজ বরং থাক, খাবারের লাইনের কাজ করতে হবে, রাত এ সয়াবিনের তরকারি আছে।এই তো গানের জোড় তৈরি হয়ে গেল, এবার থেকে বসে পড়লেই হল।আমার একটু মিউজিক না পেলে স্কেল টা ম্যাচ করে না। আজ পালাই, বটঠাকুর নাহলে সুপারকে কানভাঙাবে।
উত্তমদা ছফুটের শরীরটা নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেল।বুনো বললো-মিউজিক না কচু, স্কেল তো পরে ফেলবে, গলাটা দেখেছিস!পুরো ফাঁটা বাঁশ হয়ে গেছে,ধোঁয়া টেনে টেনে, এরপর আমরা আবার কিশোরকুমারকে সরিয়ে নিজেদের গানের মধ্যে ঢুকে গেলাম।
সেবার যখন গরমটা ধরে আসছে, প্রায়দিনই আশা জাগিয়ে দূরে কোথাও কালোমেঘ করছে অথচ বৃষ্টি আসছে না, সন্ধের পর মোলায়েম হাওয়া দেয়-একদল ছেলে বৃষ্টি হচ্ছে না বলে মদ খাচ্ছে আরেকদল ছেলে আজকে-রাতেই-বৃষ্টি-হবে এই আশায় মদ খাচ্ছে, উত্তমদা বুনোর ঘরে এসে হাজির হলো।মাঝে সপ্তাহখানেক একেবারেই পাত্তা ছিল না, মেসঘরে দেখা হচ্ছিলো, হেসে ভাতের কড়াই এগিয়ে দিচ্ছিলো বা সয়াবিনের বাটি পাস করছিল।তখন লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি, চুলের মাঞ্জা কম, যেদিন আবার এলো সেদিন ধোপদুরস্ত, গোলাপি জামা-সাদা প্যান্ট।সেরাতে হোস্টেলে ফিস্ট ছিল, বিরিয়ানির গন্ধে চর্তুদিক ভুরভুর, তিনতলার বারান্দায় আমাকে দেখতে পেয়ে বললো-এই দ্যাখেন, আপনার জন্য আনলাম
-কিসের সিডি?
-আমার গাওয়া গানের সিডি।কয়েকবছর আগে রেকর্ড করিয়েছিলাম, ডেমো সিডি।উত্তমদা বললো
-কত দাম দিতে হবে?
তখনো সাইকেলের দাম দিয়ে উঠতে পেরেছিলাম বলে মনে পড়ে না।তার উপর গানের সিডি।উত্তমদা জিভ কেটে বললো-গিফট!মিউজিকের কদর কি সবাই করে!
কালো রঙের কভার।হাতে নিলাম।চকচক করছে।সাদা খয়েরিতে বড় আকারে কিশোরকুমারের আবক্ষ ছবি, বুকপকেটের জায়গায় উত্তমদার মুখ সুপারইমপোজ করা।তখনকার বাবরি চুল, মাথার পিছনে আলোর ঝিকিমিকি।সিডির নাম-ভালোবাসায় কিশোর।দুএকটা গান শুনবেন নাকি, চলেন বুনোবাবুর ঘরে যাই।
বুনো বাবুর ঘরে গিয়েও লাভ বিশেষ কিছুই হলো না, বুনোবাবুর কম্পিউটারের ক্যাবিনেট খোলা, মাদারবোর্ডের উপর কেকের প্যাকেট রাখা।সপ্তাহ ঘুরতে চললো, এখনো কম্পিউটার ঠিক হয়নি।নতুন রেকর্ডিং সফটঅয়ার ইনস্টল করতে গিয়ে কম্পিউটারটাই ঝুলে গেছে।
উত্তমদা বললো, আর তো কপি নেই, এখান থেকেই কম্পিউটারে নিয়ে নিতে পারবেন না? বুনো সিডিটা চেয়ে নিয়ে চকচকে চোখে দেখলো।এমন একটা সিডির স্বপ্ন, আমাদেরও, স্বীকারে সংকোচ।জিজ্ঞেস করলো-কোথা থেকে রেকর্ড করালে উত্তমদা?
উত্তমদা আজ খাটে বসলো।–ফোরশোর রোডে প্রলয় বলে একটা ছেলের স্টুডিও খুলেছিল।হৈমন্তীদির সঙ্গে ড্রাম বাজাতো।ওখানেই সস্তার প্যাকেজে দশটা গান রেকর্ড করিয়ে ছিলাম।আমার বাপ তখনো বেঁচে।
-কত পড়েছিল?
-দশটা গান মিলিয়ে কুড়ি হাজারের মত।পাঁচ বছর আগের কথা যদিও।
-বেশ সস্তা তো, হ্যান্ডসদের পয়সা দিতে হয়নি?
উত্তমদা সেই পরিচিত হাসি হাসলো-হ্যান্ডস আর কোথায়! ক্যারাওকে তো, পিছনে ট্র্যাক বাজছে।আমি শুধু গেয়েছি।কিশোরকুমারে ক্যারাওকের সিডি চল্লিশ টাকায় পাওয়া যায়।সেই সিডি মাথায় ঠেকিয়ে ঝোলায় পুরে শো করতে যেতাম।সেই সিডি দিয়েই নিজের সিডি বানিয়ে ফেললাম।গুরু কি কিছু কম দিয়েছে লাইফে!
-সেই দশটা গানই, এখানে?
-আমার জীবনে ওই দশটা গানে।আমাদের সব্বার লাইফেই, ওই দশটা।এর বাইরে তো কিছু লাগে না।ওর মধ্যেই আছে আনন্দ, পেঁয়াজি, শয়তানি, ভালোবাসা-সব রয়েছে।শুধু গেয়ে দিলেই হল।সিডির ব্যাকে দেখো, লেখা রয়েছে।একদিন পাখি উড়ে যাবে, বেশ মন-ইয়ের গান, তারপর গিয়ে নয়ন সরসী একদম যাকে বলে ক্ল্যাসিকাল লাভ সং-এই যে নদী যায় সাগরে, প্রেম কেটে যাওয়ার গান।
বুনো উত্তমদাকে থামিয়ে বললো-কিশোরকুমারকে একদম রবীন্দ্রনাথ বানিয়ে দিলে তো উত্তমদা, পূজাপর্ব, প্রেমপর্ব হা হাহা। উত্তমদাও হাসলো।
-আছে গো আছে, বুনোবাবু, কিছু তো আছেই, পাড়াগাঁয়ে লোকজন, রক-পপ তো শোনেনা, এসব শোনে।আবার শহরে-গঞ্জে রকপপ শুনেও লোকে এসব শোনে।
-তোমার আজ ডিউটি নেই?
-আজ হোটেলের চাচা এসে বিরিয়ানি রাঁধছে, আমার হাত তাই ফাঁকা।
-বেশ, এখন শো করো?
-টুকটাক করি আর কি, আগের মত আর ঘুরে বেড়ানো হয় না।বাপ মরেছে।বাপ মরা কেসে বাপের চাকরিটা পেলাম।রিলেটিভরা বললো, দুমুঠো খেতে আর হিল্লিদিল্লি করে বেড়ানো কেন!
-শুনে নিলে সবার কথা?
-নিজের মনের কথাই শুনলাম।গায়েগঞ্জেঘুরে বেড়াই, এ্কে ওকে ধরি।মান অপমান বোধ তো কুকুরেরও থাকে।যতদিন বাপ বেঁচে ছিল চামরা মোটা করে চলতাম।এই যে ক্যাসেট বানানোর টাকা, আজ বাপ মরেছে, মিথ্যে বলবো না, বাপের জমানো টাকা হাতিয়ে বানানো।হস্টেলের মশালচির চাকরি পেয়ে ততদিনের অপমানটা দগদগে হয়ে উঠলো।খাওয়াপড়ার চিন্তাটা ঘুচবে, পয়সাও আসবে, গানবাজনা করতে তো আর বাঁধা দিচ্ছে না কেউ।মাথা উঁচু করে শো করবো।আসল কথা হল বিশ্বাস, মিউজিক করে বেঁচে থাকবো, এই বিশ্বাসটা টলে গেল।আমার মত গলা নিয়ে ছেলেগুলো ট্রেনে গান করে পয়সা চায়।
-সেটাই তো, শো করা ছাড়লে কেন? চাকরি তো রইলোই।
উত্তম বললো-মানুষের মনও মিছেকথা বলে বাবু।ঈশ্বর জানেন কেন এই রান্নাঘরে মজে গেলাম।আগে রেওয়াজ করতাম, এখন মিকচার গ্রাইন্ডারের কথা মাথায় বেশি ঘোরে, গানবাজনার চিন্তা পরে আসে।তোমরাও, তো আজ বাদে কাল চাকরি করবে, তখন এই উত্তম মাহাতোর কথাগুলো স্মরণ করে দেখো।
লাইনের কাজ থাকায় উত্তমদা উঠে গেল, বুনো আমাকে ঝেড়ে বললো-একেকটা পিস কোথা থেকে ধরে আনিস বলতো?কে শুনবে এই কিশোরকুমারের চোত!আজকাল তুই না থাকলেও দুপুর বিকেলে চলে আসছে।বলে এ-টা ধরো, বি মাইনর-টা ধরো।গলায় ভাঁজ খাওয়াও।আমি শালা তখন ক্যাট স্টিভেনস শুনছি,তার মধ্যেই আপন খেয়ালে উত্তমকুমার বাংলাগান শুরু করে দেয়।
-দশটা শিল্পির ব্যর্থতা দ্যাখ, তবেই গিয়ে সফল হবি একদিন।আমি বলি।
-সফল তো পরে হবো, আগে তো একে সামলাই।
উত্তমদাকে সামলানো ততদিনে আমাদের সাধ্যের বাইরে, যেমন এ হোস্টেল ও হস্টেল থেকে ছেলেপুলেরা বুনোর সঙ্গে গানবাজনা করতে চলে আসে, উত্তমদাও তেমনি প্রায় সন্ধেতেই চলে আসে। গানবাজনা হলে চুপচাপ শোনে।নিজে কখনোবা গায়।ছেলেদের মধ্যে কেউ যন্ত্র নিয়ে এলে সেসব নেড়েচেড়ে দেখে, যিশুর ড্রামে কাঠি দিয়ে তাল তোলে, সায়ন এর ইলেকট্রিক গিটারে হাত বোলায়।কম্পিউটারে ডোনোভান চললে শোনে।অর্কর বাঁশি হাতে নিয়ে পোজ মারে।ইম্পিরিয়াল ব্লু থাকলে খায়, এন্টিকুইটি থাকলে সাধলেও খায় না।গাঁজায় আপত্তি নেই।এদিকসেদিকের গল্প করে।বুনোর কাছে মাঝেমধ্যেই ভাইঝির এমন প্রশংসা করে , মনে হয় বুনোর বিয়ের ব্যবস্থাটা অচিরেই সেরে ফেলবে।বটঠাকুর হাঁকডাক দিলে দৌড় দেয়।
একটা হস্টেলে যদি একশোটা ছেলে থাকে তাহলে অন্তত একশোটা গল্পের আশা করা যায়।এর মধ্যে উত্তমদার গল্পটাও ঢুকে গেছিলো।এই গল্পগুলোর কোনটা জোরালো হয়ে ওঠে, কোনটা আলগা পড়ে যায়, কোন গল্পের প্রধান চরিত্ররা হারিয়ে যায় চিরতরে, অনেকদিন পর এত গল্পের মধ্যে থেকে একটামাত্র গল্পকে আলাদা করে তুলে আনা বেশ শক্ত কাজ বইকি!বাকি গল্পগুলোর শাঁস-আশ-সিগারেটের গন্ধ এই গল্পের গায়ে লেগে থাকে।
যদি যেমনতেমন করে তুলে আনাও গেল তবু কবে যে গল্প গুলো শেষ হয়ে গেল বোঝা যায় না।উত্তমদার গল্পের যদিও একটা শেষ আছে।হস্টেলে আমাদের দিনগুলোও শেষ হয়ে যাচ্ছিলো, অনেক ছেলের সঙ্গেই হইয়তো চাকরিসূত্রে যোগাযোগ থেকে যাবে, কারুর বিবাহে, বাচ্চার অন্নপ্রাশনে নিমন্ত্রন পাবো কিন্তু উত্তমদার সঙ্গে আর দেখা হবে না, দেখলেও আর গান নিয়ে বসা হবে না।হস্টেলের ছেলেরা নিজেরাই নিজেদের জন্য একটা ফাংশান করবে বলে ঠিক করলো, ফেয়ারওয়েল। নাটক হবে, আবৃত্তি হবে, গান হবে।সেটাই বুনোর প্রথম স্টেজ , একক।আমার লেখা কয়েকটা গান, দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত, কয়েকটা ব্যান্ডের গান-এভাবে বুনো নিজের জন্য বরাদ্দ সময়টুকু সাজিয়েছে।জুনিয়ার ব্যাচের কয়েকটা ছেলে গিটার-ড্রামস বাজাবে।বুনো ক্ল্যাসিকাল ফর্মেশানে বিশ্বাস করে।তাই শেষমেষ সিন্থেসাইজারের জায়গা হলো না।সুদীপ বলে একটা ছেলে প্রয়োজন পড়লে স্টেজে উঠে ঝুনঝুনি ধরবে।তিনটে গিটার, একটা ড্রাম সাকুল্যে। রিহার্সাল চলছে, পুরোদমে। বিশেষ কোন কাজ না পেয়ে আমি একটা পোস্টার ডিজাইন করে দিলাম।গানের কথা ড্রয়িংপ্যাডে পরিষ্কার হাতের লেখায় লিখে দিই-যাতে স্টেজে উঠে বুনোর খেই না হারিয়ে যায়।পালোয়ান নামবে লড়াই এ, সাগরেদরা কেউ গা-মালিশ করে কেউ মুখের সামনে খাবারটা ধরে যেমন।
উত্তমদা দশমিনিটের একটা স্লট পেয়েছে।ম্যানেজারকে যথেচ্ছে গাঁজাসাপ্লাই দেওয়ার বিনিময়ে।দুটোগানের বেশি কোনমতেই নয়।ছেলেদের ফাংশান, ছেলেরাই যা করার করবে, ফাংশানের শুরুতে সুপার এর স্পিচ আছে।
ম্যানেজার আমাকে বললো-একটা প্রফেশনাল আটিস্ট লিস্টে থাকলে ভালো, এদিকওদিক হলে সামলে দেবে।উত্তমদা বললো-দশটা গান রেডি, নটার কমে তো নামবই না।
অনুষ্ঠানেরদিনবুনোহোঁচটখেলরীতিমত, গানেরফাঁকেগল্পগাছাকরতেগিয়েতোতালালো।ঝুনঝুনিশিল্পি মেকআপরুমে মদ খেয়ে উলটে রইলো।গিটারের সঙ্গে গলা মিললো না।গলা যখন একদমই প্রায় শোনা যাচ্ছে না তখন মঞ্চ থেকেই সাউন্ডসিস্টেমের লোকজনকে গাল পেড়ে বসলো।অনুষ্ঠানটা হচ্ছিলো ইনস্টিউট হলে, বেদম বৃষ্টি পড়ছিলো সারাদিন।ঝুপসি ভেজা হয়েও তবু হলভর্তি ছেলেমেয়েরা, হ্যাঁ মেয়েরাও, মেয়েদের হস্টেলের, এসেছিল।তাদের আওয়াজে থাকা দায়।চারনম্বর গানের মাথায় বলাকওয়া নেই, স্টেজ ছাড়লো।বুনোই শুরুর আর্টিস্ট।এরপর নাটক, আবৃত্তি, মুখে কেউ বলছে না কিন্তু সবাই বেশ চাপে, এরপরেই স্টেজ নেওয়ার অস্বস্তি।উত্তমদা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল।
ম্যানেজার সঞ্চালনা করছিল, উত্তমদাকে বললো-যাবে না কি?
উত্তমদা ক্যারাওকের সিডিটা ম্যানেজারের হাতে ধরিয়ে দিল।ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজনা বেজে উঠলো।একরাশ স্পটলাইটের মধ্যে দিয়ে উত্তমদা মঞ্চে উঠে এলো।যে সাইকোডলিক আলোগুলো বুনোর পারফরম্যান্সের পর নিভে গেছিলো, সেগু্লো আবার নেচে উঠলো, উত্তমদা ওই আলোর নিচে অল্প খোঁড়াচ্ছে, গায়ে কালো জামা , তাতে সাদা লেস, জ্বলজ্বল করছে।কালো, চাপা প্যান্ট।সূচালো জুতা।শ্রোতারা নেচেছে, ঝাঁপিয়েছে, গলা মিলিয়েছে।উত্তমদা, মাচার ভাষায়, কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অধিকাংশ শ্রোতাই বাদলা দিনের আবেশে হালকা নেশার ঘোরে ছিল।তাদের সব অভিযোগ ধুয়ে গেল।
উত্তমদাকে দশটা গানই গাইতে হয়েছিল।তারপরও অডিয়েন্স চাইছে, আরো হোক।উত্তমদা নমষ্কার করে স্টেজ ছাড়ছিলো, দেখলো উইংসের গাঢ় অন্ধকারে বুনো।বুনোর হাত ধরে টেনে বললো-চলো, বুনোবাবু, একসঙ্গে এগারো নম্বর গানটা গেয়ে আসি।
বুনো মাটিতে মিশে যেতে পারলে ভালো বোধ করতো।
-সিড তে তোদশটা গান।ক্যারাওকে কোথায় পাবে?
-খালিগলায় গাইবো, দুজনে।আমি ধরছি, তুমি ফলো করবে।
বুনো আপত্তি করলো না।বললো-আমার প্রোগামটা ছড়িয়ে গেল, উত্তমদা।
-এসব কত হয়, পরের আর্টিস্ট এসে মেকআপ দিয়ে দেয়।কমন এসব।ফাইনাল টাচতা একসঙ্গে দিতে হয়। একদম স্ক্রিপ্টের মত। বলে বুনোকে হ্যাঁচকা টান দিল উত্তমদা।
ম্যানেজার এনাউন্স করার আগেই দুজনে ফের স্টেজে।আন্দাজ করতে পেরে জনতার হাততালি।এগারো নম্বর গান।সাইকোডলিক সচল হল।উত্তমদা লিড নিল-
হয়তো আমাকে কারো মনে নেই, আমি যে ছিলাম এই গাঁয়েতেই।