Prostitute-3সোনাগাছিতে দাসবাবু

কখনও বেশ্যাবাড়িতে গিয়েছেন দাসবাবু ?
চেয়ারে বসে ইয়ার্কির ছলে দাসবাবুর দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল সাগর চ্যাটার্জি৷ সাগরবাবুর এমন প্রশ্ন শুনে আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম৷ ভাবলাম সাগর চ্যাটার্জির এমন বিশ্রী প্রশ্নে হয়ত দাসবাবু রেগে যাবেন৷ প্রায় দশ দিন পরে ছেলের বিয়ে চুকিয়ে আমাদের আড্ডায় যোগ দিয়েছেন৷ ডায়মন্ড হারবারে বিয়ে নিয়েই আলোচনা করছিলাম ওনার সঙ্গে৷ সাগরবাবুর হঠাৎ এমন প্রশ্নে আমরা রীতিমতো হতবাক৷ তবে যা ভেবেছিলাম তা ঘটল না৷ সাগরের এই কথা শুনে চায়ের কাপ থেকে ঠোঁট সরিয়ে স্মিত হাসলেন দাসবাবু৷ তারপর বললেন, হ্যাঁ, ভায়া বেশ্যাবাড়িতেও গিয়েছিলাম আমি৷ এক-বার নয় দু’-দু’বার৷
দাসবাবুর কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম৷ বলে কি লোকটা? দাসবাবুর মতো ভদ্রলোক বেশ্যাবাড়িতে? মনে মনে ঘটনাটা কল্পনা করে নিতেই বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করলাম৷ পরে অবশ্য বেশ খারাপও লাগল ব্যাপারটা ভেবে৷ তারপর ভাবলাম দাসবাবু মজাও করতে পারেন আমাদের সঙ্গে৷ দাসবাবুর মতো লোক সব সময়ই মজা করতে ভালোবাসেন৷ যে লোকটা ছেলের বিয়েকে নিজের বিয়ে বলে চালিয়ে দিতে পারেন, সেই লোকটার পক্ষে সবই সম্ভব৷
তাই আমি বেশ কৌতূহল নিয়ে দাসবাবুকে প্রশ্ন করলাম, সত্যি বলছেন দাসবাবু, আপনি বেশ্যাবাড়িতে গিয়েছিলেন?
আমার কথায় দাসবাবু বেশ দৃঢ় কন্ঠে বললে- হ্যাঁ ভায়া, একবার নয়, দু-দু’বার সোনাগাছিতে গিয়েছিলাম৷
আমার তো চক্ষুস্থির৷ আমার পাশে বসা সাগর চ্যাটার্জি বললে-সেকি! দাসবাবু আপনি সোনাগাছিতে গিয়েছিলেন? কবে? কখন গেলেন?
মিস্টার পাল-বললে-সত্যি?
দাসবাবু একগাল হেসে বললে-হ্যাঁ৷ ভায়া৷ সত্যি সত্যিই সোনগাছিতে গিয়েছিলাম৷
সাগর চ্যাটার্জি রীতিমতো সোজা হয়ে বসে বললে- তাহলে আপনার সোনাগাছি দর্শনের কাহিনিটা একটু বলুন?
আমি মনে মনে বললাম- ফের গুলের কাহিনি শুনবে হবে আমাদের৷ এর মধ্যে কতটা সত্যি, আর কতটা মিথ্য রয়েছে কে জানে?
চায়ের কাপে ফের চুমুক দিয়ে গল্প শুরু করলেন দাসবাবু৷ বললে লাগলেন- তখন আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়ি৷ কলকাতার মেসে থাকতাম আর মাঝেমধ্যে ডায়মন্ডহারবারের বাড়িতে যেতাম৷ পুজোর ছুটি পড়তেই ডায়মন্ডহারবারের বাড়িতে ফিরে গেলাম৷ চতুর্থীর দিনে আমার এক দাদা এসে হাজির৷ গুয়াহাটির অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এসেছে ও৷ দাদার হাতে বাবা কিছু টাকা দিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললে-‘‘ভাই-কে কিছু কিনে দিস (জামা,প্যান্ট)৷ কিছু টাকা তোকেও দিলাম কিনে নিবি৷’’
বাবার দেওয়া টাকা বিদ্যি পকেটে পুরে নিয়ে দাদা বললে- চলো ভাই৷ কলকাতায় ঘুরতে যাওয়া যাক৷ ওখান থেকেই তোমাকে পুজোর জামা-প্যান্ট কিনে দেব৷

তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়

পুজোর মুখে ফের কলকাতায়৷ আমার মনও আনন্দে নেচে উঠল৷ তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে কলকাতায় রওনা দিলাম দু’জনে৷ সেদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কলকাতার বিশিষ্ট জায়গা ঘুরলাম৷ কফি হাউস, প্রেসিডেন্সি… বড়বাজার ঘুরে আমরা গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের কাছে এলাম হেঁটে হেঁটে৷ এরপর আমরা বাড়ি ফেরার উদ্যোগ করছিলাম৷ এমন সময় দাদা আমার কানের কাছে মুখটা এনে বললে- কলকাতার অনেক জায়গা তো ঘুরলি, এবার আরও একটা বিখ্যাত জায়গা তোকে ঘুরে দেখাতে চাই৷
আমি বললাল- কী জায়গা? কোন বিখ্যাত জায়াগায় নিয়ে যাবে?
দাদা কানের কাছে মুখটা নিয়ে বললে- তোকে আজ সোনাগাছি দেখাব৷
সোনাগাছি নামটা শুনেই আমার শরীরে বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল৷ কলেজের বন্ধুদের মুখে সোনাগাছির নাম শুনেছি ৷ তবে ওটা যে কোথায় তা কোনওদিন দেখিনি৷ কোনওদিন যায়নি ওখানে৷ বললাম- সেটা কত দূরে?
আমার কথায় মুখে হাসি নিয়ে দাদা বললে- আর কিছুক্ষণ পরেই দেখতে পাবি সেই বিখ্যাত জায়গা৷
আমার মনে উত্তেজনার চোরাস্রোত বইছে- বললাম- সোনগাছি৷
আমার কথায় দাদা ঘাড় নেড়ে বললে- হ্যা৷ একটু পরেই৷
চতুর্থীর দিন৷ সামনেই পুজো৷ এমনিতেই রাস্তায় আলো ঝলমল করছে৷ সোনগাছি গিয়ে দেখলাম অষ্টমীর দিন চলে এসেছে৷ রাস্তার দু’ধারে সুন্দর-সুন্দর মেয়েরা দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ মনেই হচ্ছে না এরা বেশ্যা৷ অপরূপ লক্ষ্মীর মতো মেয়েগুলোকে দেখছিলাম৷ আমি দাদার হাত ধরে সোনাগাছির রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম৷
তবে যত ভিতরে ঢুকছিলাম ততই আমার পা সরছিল না৷ মনে মনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম৷ লক্ষ্য করলাম আমার দাদাটি বেশ উপভোগ করতে করতেই সোনাগাছির ভিতরে ঢুকতে শুরু করেছে৷ দাদাকে বললাম- আমার ভয় করছে রে৷
আমার কথার উত্তরে দাদা বললে-ভয় ! আমি থাকতে ভয় কি৷
আমি জানি না ওর কি ক্ষমতা আছে৷ তবে দাদার আশ্বাস পেয়ে আশ্বস্ত হলাম৷ বললাম-তবুও
দাদার গলার আওয়াজ এবার আরও জোর৷ বললে- শোন ভাই৷ সোনাগাছি কি জিনিস আমাকে শেখাস না৷ কলকাতা এলেই আমি মাঝে মধ্যেই এখানে আসি৷ এখানকার মেয়েরা আমাকে চেনে৷ তাই আমি সঙ্গে থাকতে কোনও ভয় পাবি না৷
কিছুদূর চলার পরেই দেখলাম একটি মেয়ের সঙ্গে দর কষাকষি করছে আমার বিখ্যাত দাদা৷ মেয়েটি অবাঙালি৷ দাদা হেসে বললে- বিশ-মে চলেগা৷
মেয়েটির শরীরের দাম পঞ্চাশ টাকা৷ দাদার ওই দাম শুনে মেয়েটি বললে-বিশ মে করেঙ্গে? দাদা এর থেকে বেশি দাম দিতে রাজি নয়৷
শেষ পর্যন্ত দরাদরির জন্য পুরো বিষয়টাই ভেঙে গেল৷ আমরা ফের এগোতে শুরু করলাম৷ একটি পান দোকানের সামনে গিয়ে শুনলাম পুলিশ রেড করতে শুরু করেছে৷ পুলিশের কথা শুনে তো আমার গোটা শরীর ঘেমে গেল৷ পুলিশ? ছি ছি ৷ পুলিশের কবলে পড়লে মানসম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হবে৷
দাদাকে বললাম- বাড়ি ফিরে চলো দাদা৷ আমার কথায় কোনও পাত্তাই দিল না সে৷ হনহন করে হেঁটে চলল, যেদিকে পুলিশ রয়েছে৷ আমার চিন্তা আরও বাড়ল৷ এবার একটি নেপালি মেয়ের সঙ্গে কথা শুরু করল আমার সেই দাদাটি৷ নেপালি মেয়েটি খুব সুন্দরী৷ বললে তার রেট একশো টাকা৷ সুন্দরী নেপালি মেয়েটিকে দেখেই ফিদা হয়ে গিয়েছে দাদা৷ এবার দাদাও বিশ টাকা থেকে আশি টাকায় উঠে গিয়েছে৷ নেপালি মেয়েটি গড়রাজি৷ সে আশি টাকায় শরীর বিক্রি করবে না৷ এদিকে সময় এগিয়ে চলেছে৷ কিন্তু দাদা নেপালি মেয়েটির সঙ্গে দরাদরি করেই চলেছে৷ শেষ পর্যন্ত ৯০ টাকায় রফা হল৷ পাশে দাঁড়িয়ে আমি রফার কথা শুনছিলাম৷ ওদের রফার কথা শুনে আমি মহাবিপদে পড়লাম৷ দাদা আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি কী করব? কোথায় দাঁড়াব৷ পুলিশের কথা শুনে এবার শিরদাঁড়া হীম হয়ে গেল৷ কিন্তু দাদা নাছোড়৷ ওই নেপালি মেয়েটির সঙ্গেই ওর ঘরে যাবে৷ আমি দাদার হাত দুটো ধরে বললাম-যাসনে দাদা৷ এভাবে চলে গেলে আমি বিপদে পড়ব৷
দাদা আমার কাঁধে হাত বুলিয়ে বললে-না না ভয়ের কি আছে? আমি আধ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুরে আসব৷ এই নেপালি মেয়েটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে আসি৷
দাদার মুখে কিছু আটকায় না৷ দাদার কথা শুনে নেপালি মেয়েটি হাসছিল৷ ও ৯০ টাকার খদ্দের পেয়ে বেশ খুশি৷
এবার হাত ছেড়ে দাদার পা-দুটো ধরলাম৷ বললাম– আমাকে একা রেখে যেও না৷ আমি রীতিমতো একরোখা হয়ে উঠেছি দেখে দাদা বিরক্ত হয়ে নেপালি মেয়েটিকে না করে দিল৷ দাদার না শুনে মেয়েটিও হতাশ৷ এবার ফের কিছুটা এগিয়ে গেলাম৷ লক্ষ্য করলাম দাদা আমার ওপর রাগে কথা বলছে না৷
আমি বললাম কি রে৷ রাগ করছি৷
দাদা বললে- ধুস৷ তোর মতো ন্যাকা ছেলে নিয়ে কোনও কাজ হয় না৷ তুই এমন ভীতু ছেলে জানলে তোকে সোনাগাছিতে আনতাম না৷
আমি আর কথা বাড়ালাম না৷ সত্যিই আমি ভীতু ছেলে৷ দাদা ঠিকই বলেছে৷ সোনাগাছিতে যারা আসে তারা ভয়ডরহীন৷ দাদা গজরাতে গজরাতে বলে চলেছে- জানিস তোর জন্য আজ কি মিস করলাম৷ ওই নেপালি মেয়েটির পাছা দেখেছিস৷ ওর বুক দুটো দেখেছিস৷ এমন অশ্লীল কথা শুনে আমি চুপ করে রাইলাম৷ দাদা বললে- এমন সুন্দর একটা মেয়েকে দলায়-মলায় করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম শুধুমাত্র তোর জন্য৷
দাদার রাগ সপ্তমে উঠে গিয়েছে৷ ওর রাগ কমানোর জন্য বললাল চা খাবি৷ আমার মুখে চায়ের কথা শুনে দাদা আরও রেগে গেল৷ বললে- চা তুই খা৷
এবার আর কোনও মেয়ের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে দাদা উল্টোদিকে হনহন করে হাঁটা লাগাতে শুরু করেছে৷ আমিও দাদাকে অনুসরন করলাম৷ আমি বললাম- কিরে বাড়ির দিকে ফিরছিস তো? দাদা বললে-তা ছাড়া আর কি করব৷ তোর মতো গোবিন্দকে নিয়ে তো আর বেশ্যাবাড়িতে যাওয়া যায় না৷ আমরা সোনাগাছি ছাড়ছিলাম৷ তখন আমাদের আসেপাশে দালালদের ভীড়৷ ওরা দাদাকে বলছে- ‘সাব ফরেনার হ্যায়৷ চলেগা?’ দাদা জিজ্ঞাসা করলে যাচ্ছিল কিমত কিতন্যা৷ কিন্তু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কোনও কথা বাড়ালো না৷
দাসবাবু গল্প থামিয়ে ফের চায়ের কাপে চুমুক দিল৷ আমরা সকলেই বাকরুদ্ধ হয়ে দাসবাবুর গল্প শুনছিলাম৷ মিস্টার পাল বললেন-আপনার দাদাটি তো একখানা চীজ৷ তবে আপনার জন্য বেচারা বঞ্চিত হয়েছে৷
দাসবাবু বললেন- তখন অল্প বয়স৷ খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷
আমি বললাম- একদিকে ভালোই হয়েছিল৷ একদিনের জন্য হলেও দাদাটিকে কুকর্ম করার থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন৷
আমার কথায় দাদাবাবুর মুখে চওড়া হাসি খেলে গেল৷ বললেন- যা বলেছো ভায়া৷ সেদিন দাদাকে আমিই পাপ কাজ থেকে বিরত করেছিলাম৷
সাগর চ্যাটার্জি বললে- দাসবাবু আপনি দু’বার বেশ্যবাড়িতে গিয়েছেন৷ একবারের গল্প শুনলাম৷ এবার দ্বিতীয়টা শুনি৷
দাসবাবু গল্পের জাল গুটিয়ে বললে- আজ নয় ভায়া৷ ওই গল্প অন্য দিন বলবো৷ আমরাও উঠলাম৷

                                                                                                                                                                    প্রতীকী ছবি