ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য
ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য

আধুনিক বাংলা কবিতাকে চিরাচরিত আবেগ থেকে মুক্তিদানের প্রথম প্রয়াস চালিয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৮৭-১৯৫৪)। রবীন্দ্র সাহিত্যের দোর্দ- প্রতাপের মধ্যে তিনি সাহিত্যকর্ম শুরু করেও রবীন্দ্র নিগড় থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর সেদিক দিয়ে তিনি নজরুল ও তিররিশের কবিদের পূর্বসূরিত্বের দাবিদার। ‘দুঃখবাদী কবি’ বলে খ্যাতি অর্জন করলেও তিনি ছিলেন সমাজসচেতন ও মানবতাবাদী কবি। তাঁর দুঃখের সূতিকাগার ছিল মানবপ্রেম। মানুষের দুঃখ-বেদনা সামাজিক অবিচার ও বৈষম্যে তাঁর কবি হৃদয় হাহাকার করে উঠেছিল। বাংলা কবিতার প্রবল রোমান্টিক যুগে জন্মগ্রহণ করেও, রোমান্টিক আবহে নিমজ্জিত থেকেও তিনি কবিতাকে বাস্তবতার কঠিন মাটিতে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পেরেছিলেন।
যতীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন যুক্তিবাদী ও মননশীল লেখক; সমাজ ও সমকাল তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু। ভাষার মধ্যে তর্ক, কটাক্ষ ও প্রচ্ছন্ন পরিহাস তাঁর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দর্শন ও বিজ্ঞান উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি ছিলেন দুঃখবাদী, আর এই দুঃখবাদ তাঁর কাব্যের মূল সুর। প্রকৃতি ছলনাময়ী, জীবন দুঃখময়, সুখ অনিত্য ও ক্ষণিকের এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জগৎ-সংসারকে দেখেছেন। কোনোরূপ ভাববাদের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি দুঃখ ও নৈরাশ্যের চিত্র এঁকেছেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মরীচিকা (১৯২৩), মরুশিখা (১৯২৭), মরুমায়া (১৯৩০), সায়ম্ (১৯৪০), ত্রিযামা (১৯৪৮), নিশান্তিকা (১৯৫৭) এবং কবিতা-সংকলন অনুপূর্বা (১৯৪৬)। প্রথম তিনখানি কাব্যের নামকরণে অগ্নি, রুদ্র ও মরুর দহন এবং শেষের তিনটির নামকরণে রাত্রির অন্ধকারের প্রতীক-দ্যোতনা প্রকাশ পেয়েছে।
যতীন্দ্রনাথের মতে মানুষের জীবনের প্রথমার্ধ অবিরত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে অতিবাহিত হয়, দ্বিতীয়ার্থে অপরাধ জরা-ব্যাধি ভারাক্রান্ত অবসন্নতা নেমে আসায় রাত্রির অন্ধকার-সদৃশ অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে। প্রেম, প্রকৃতি বা ঈশ্বর মানবজীবনের দুঃখের দহনজ্বালা ও নৈরাশ্যের অবসন্নতা দূর করতে পারে না। তাঁর বিশ্বাস ছিল এমন যে, ঈশ্বর স্বয়ং দুঃখময়, ঈশ্বরের বার্তা মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না; জগৎ যেমন তেমনই থাকে; প্রেম বলে কিছু নেই, চেতনাই জড়কে সচল করে।
যতীন্দ্রনাথের ভাষা আবেগমুক্ত ও যুক্তিসিদ্ধ; তিনি সরাসরি বিষয়ের প্রকাশ ঘটান। তবে অন্ত্যপর্বের কাব্যগুলিতে তাঁর রোম্যান্টিক বিহবলতা ও চাঞ্চল্য প্রকাশ পেয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর জীবনদর্শন ও রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর জীবনদৃষ্টিতে মানবতাবাদ ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর মমতা লক্ষণীয়। শেষ বয়সে তিনি ম্যাকবেথ, ওথেলো, হ্যামলেট, কুমারসম্ভব ইত্যাদি অনুবাদ করেন। তাঁর কাব্য-পরিমিতি (১৯৩১) একটি  সমালোচনামূলক গদ্যগ্রন্থ। মাসিক বসুমতীতে (১৯৪৯) ‘বিপ্রতীপ গুপ্ত’ ছদ্মনামে তিনি স্মৃতিকথা নামে  আত্মজীবনী প্রকাশ করেন।

বাংলা কাব্যকে অবাস্তব কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁকে একজন পথিকৃৎ বলা যায়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরে তিনিই মনে হয় প্রথম কবি যিনি সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর জয়গান গেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যেখানে সমাজ সংস্কারের ভূমিকাকে তেমন গুরুত্ব দেননি, যতীন্দ্রনাথ সেখানে চাইলেন বাস্তব কর্মজগতের মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে। তিনি বলেন –

কর্মশালার সর্বদুয়ার
খুলে ডেকে লও মোরে,
কর্মের তাপে ঘর্ম ঝরুক
শিলাজতু নির্ঝরে
(আবেদন, মরীচিকা)

বহুকালচালিত সংস্কার শাসন নিষ্পেষণ এবং ধর্মের নামে মানুষকে নির্যাতনের যে অলিখিত নিয়ম চালু হয়েছিল, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সেগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। সমাজের কিছু মানুষ একদিকে জীবনের রূপ-রস-অর্থ-প্রাচুর্য কুক্ষিগত করেছে, আর অপরদিকে কিছু মানুষ কেবলই হয়েছে শোষিত। সমাজের গরিব শ্রেণীর মানুষ ধনীদের ভোগ-বিলাস উদ্্যাপনে টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যতীন্দ্রনাথ এই বৈষম্যের জন্য কেবল মানুষকেই দোষারোপ করেননি, তিনি বিধাতাকেও সন্দেহসংকুল করে ফেলেছেন। ‘তিনি ঘুমের ঘোরে, প্রথম ঝোঁকে’ কবিতায় বলেছেন-

সাগরের কূলে পুরী তব দারু মূরতি জগন্নাথ;
রথের চাকায় লোক পিষে যায়, তোমার নাহিক হাত।

‘ঘুমের ঘোরের তৃতীয় ঝোঁকে’র কবিতায় নিপীড়িত মানুষের জন্য কবির সমবেদনা প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতাবানদের নিত্যনতুন বৈভব ও ঐশ্বর্য, সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি নিয়তই অর্জিত হচ্ছে দুর্বল অত্যাচারিত মেহনতি মানুষের রক্তের বিনিময়ে। অথচ যাদের দানে এই ধনিক শ্রেণী পুষ্ট তারাই থাকছে অনাহারী।

খস্ খস্ ঠক্ চলেছে তাঁতীদের তাঁত বোনা!
এ হাত ও হাত ফিরিতেছে মাকু ধৈর্য্যের নাহি চ্যুতি,
কার সুতা খুলে দিয়ে বুক থেকে কার তরে বুনে ধুতি।
দেখিনু তন্দ্রাভরে
তাঁতীর টাকার বড় দরকার, মাকু ছুটাছুটি করে।
(ঘুমের ঘোরে, তৃতীয় ঝোঁক)

‘ডাকহরকরা’, ‘বারনারী’, ‘চাষার বেগার’, ‘পথের চাকুরি’, ‘অভাগার ভাগ্য’, ‘কান্ডারী’, ‘গাড়োয়ানের গল্প’, ‘নবান্ন’, ‘ফেমিন রিলিফ’, ‘বেদেনী’ প্রভৃতি কবিতাতে সমাজের নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের দৈনন্দিন দুঃখের চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে। ডাকহরকরার জীবনের চরম ট্র্যাজেডি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। সে অপরের প্রয়োজন মেটায় অথচ তার প্রয়োজন মিটাবার বা সুখ-দুঃখের কথা শোনার অবকাশ কারো নেই। পরবর্তীকালে রচিত সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতাটির কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। যে বারনারী সমাজে ঘৃণ্য এবং পরিত্যক্ত তাকেও যতীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। বরং এদের মধ্যে কবি উদার রমণীকেই প্রত্যক্ষ করেছেন।

যৌবনখানি বসনের মত
খুলে রাখ, তুলে পর!
কার কল্যাণে করে কঙ্কণ
সিন্দুর সিঁথা পরে;
অমর কাহারে বরিয়া লয়েছ বিশ্ব সয়ম্বরে

কিংবা

নহ মা ঘৃণ্য, কৃপার পাত্র
আজ যে বুঝেছি খাঁটি-
মায়ের পূজায় কেন লাগে তোর
চরণে দলিত মাটি।
(বারনারী, মরীচিকা)
jatindranath
পরবর্তীকালে নজরুল ইসলামও বারাঙ্গনাকে মাতৃত্বের আসনে বসিয়েছিলেন। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই নীতিবাক্য আমরা যতই ঘোষণা করি না কেন, বাস্তবক্ষেত্রে এই সত্যকে আমরা মেনে চলি না। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজব্যবস্থায় শ্রমজীবী চাষী-মজুরদের শোষণ-শাসনের কৌশলই কেবলমাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। একটা শ্রেণীগত বিভেদ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে। ফলে শ্রমজীবী মানুষ তাদের অধিকার থেকে চিরদিন বঞ্চিত হয়েছে। যে কৃষক পায়ের ঘাম মাটিতে ফেলে ফসল ফলায় সেই থাকে নিরন্ন। যে শ্রমিক দালান কোটা নির্মাণ করে সেই শ্রমিক সেখানে ঠাঁই পায় না। যে তাঁতি কাপড় তৈরি করে সেই তাঁতির বস্ত্র থাকে না। কবি তাই বেদনার সঙ্গে বলেন –

হালের ফলকে লক্ষ্মী উঠিলে করিয়া দান
লক্ষ্মীমানের ঘরে
দুর্ভিক্ষের ভিক্ষার ঝুলি ভরিয়া, প্রাণ
দেয় যারা নিজ করে
বেতসের মত সত্য শিক্ষা শেখেনি যারা
হাওয়ার নেশায় মাতি
বটের মতন খোলা মাঠে আজও রয়েছে খাড়া,
তারা মানুষের জাতি।
(মানুষ, মরীচিকা)

অথচ এসব মানুষ সামান্যতম সামাজিক মূল্য এবং অর্থনৈতিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। সমাজের ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরে নির্ভর করে এদের ভালো থাকা মন্দ থাকা। নিজের ঘরে চাল নেই, ছিন্ন ঘর ছাওয়ার মত পয়সা নেই, কিন্তু রাজার আদেশে বেগার খাটতে হবে তাকে –

রাজার পাইক বেগার ধরেছে,
ক্ষেতে যাওয়া বন্ধ হল আজ;
জীর্ণচালে হল না আর দেওয়া
কোথাও দুটি পঁচা খড়ের গুঁজি,
সারা সনের অন্ন ছাড়ি
যেতেই হবে রাজার বাড়ি!
স্বর্ণচূড়ায় বর্ণ সেথায় মলিন হল বুঝি।
(চাষার বেগার, মরীচিকা)

মরুশিখা কাব্যগ্রন্থে গাড়োয়ানের গল্প এবং মরুমায়ায় প্রতীকধর্মী গল্প মৎস্য শিকারের ব্যঞ্জনাও অনেকটা সমগোত্রীয়। পথের চাকরি কবিতাতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের সুখ-দুঃখ ফুটে উঠেছে। ‘কাণ্ডারী’, ‘নবান্ন’ প্রভৃতি কবিতায় নিরন্ন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের কথা এক গভীর মমতায় প্রকাশ করেছেন কবি। দরিদ্র সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সংগ্রামশীলতা তিনি নিখুঁতভাবে অঙ্কন করেছেন। ‘নবান্ন’ কবিতায় কবি কৃষকের মনের নতুন আশার বর্ণনা দিয়েছেন-

আমি ভাবি ফসলটা নাবি, আরও কটা দিন যাক,
ভরা অঘ্রাণে ঘটে না-ত কোন দৈব-দুর্বিপাক।
মাড়াই-সরাই শেষ করে সবে খামারে দিইছি হাত,
কালকে হঠাৎ
বন্ধু দোহাই, তুলনাকো হাই হইনু অপ্রগলভ_
ক্ষমা কর সখা বন্ধ করিনু তুচ্ছ ধানের গল্প।
(নবান্ন, মরুমায়া)

‘ফেমিন-রিলিফ’ নামক কবিতায় কবি উল্লেখ করেছেন, সহায়-সম্বলহীন অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য সরকারের কাছ থেকে যেসব রিলিফ সামগ্রী আসে উচ্চবিত্তের লোকজন তাও চেটেপুটে খেয়ে নেয়। শোষণের এক নির্দয় চিত্র অঙ্কন করেছেন যতীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় –

তিন আনা চৌকা
ভুখা পেটে খেটে খা,
দলে দলে লেগে যা।
কে বলে কঠিন মাটি? না পোষায় ভেগে যা।
ঘরে বসে মড়’কে
চলছিলি নরকে
না হয় কোদাল হাতে মরবি এ সড়কে
খাট তবে খাট রে।
ডোঙা পেট কোঙা করে গোঙা মাটি কাটরে।
(ফেমিন-রিলিফ)

কিন্তু বিশ্রাম নেয়ার উপায় নেই। আহারক্লিষ্ট পরিশ্রান্ত শরীর ঝিমিয়ে পড়তেই আসবে তাগাদার পর তাগাদা। এদের পিপাসা পেতে নেই, অসুস্থ হতে নেই –

ওকে ওরে মেষ্টা।
পেল বুঝি তেষ্টা?
তোদের কষ্ট মেটে তারই তো এ চেষ্টা।
এবারের বৈশাখ
পিপাসাটা চেপে রাখ।

কিন্তু এতসব কষ্টের পরেও এই দরিদ্র-ক্লিষ্ট মানুষের কাছে কোন রিলিফ পৌছায় না। শ্রমিক তার স্ত্রীকে প্রবোধ দিয়ে বলে-

কাঁদিসনি খোকা ধন, ভাবিসনি বৌ গো!
আজ তো কেটেছি মাটি পুরো এক চৌকো।
বুকে পিঠে মাটি চাপে, এ মাটি কে মাপে রে?
হক্ মাটি মাপ দিতে বুক কেন কাঁপে রে?

‘বেদিনী’ , ‘কচিডাব’ প্রভৃতি কবিতায়ও জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত দুঃখী মানুষের কথা চিত্রিত হয়েছে। ‘পাষাণ পথে’, ‘কেতকী’ প্রভৃতি কবিতায় লাঞ্ছিত নারীর অপমানকেই কবি প্রত্যক্ষ করেছেন। সায়ম কাব্যগ্রন্থের কৃষ্ণা কবিতাটিতে পৌরাণিক কাহিনীর অন্তরালে সমকালীন নারী নির্যাতনের চিত্রই প্রতিফলিত! পাষাণ পথে কবিতার ব্যঞ্জনা সার্থক কবিতাটির সগোত্রীয়! জ্যৈষ্ঠ দুপুরের সেরা শহরের ইটপাথরে বিরাট নগর যখন প্রচ- তাপে ‘জ্বরঘোরে’ ধুঁকে, তখন কাননরানীর শিশুকন্যা বকুল অবরুদ্ধ পাষাণকারায়। অথচ এই বকুলদের জীবনেও বিকাশসম্ভাবনা থাকে; কিন্তু ক্ষমতামদমত্ত বিলাসী মানুষ আপন ভোগস্পৃহার বহ্নিতে এদের আত্মদানে বাধ্য করে। শুধু তাই নয়, নিজের ভোগবিলাসীর স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করে। মাংসের দোকানের পাশ থেকে কেনা কেতকীও একই ব্যঞ্জনা বহন করে। কবি যখন বলেন-

বৌবাজারের মোড়ে,
যেখানে ফুলের দোকানের পাশে কসাই
এ মাংস থোড়ে।

তখন ফুলের ব্যবসার পাশাপাশি মাংস থোড়ার ব্যঞ্জনাটি সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু এই অনাচার এবং অত্যাচারের জন্য শুধু মানুষ দায়ী নয়, দায়ী ধর্মও। কারণ আমাদের সমাজব্যবস্থায় যে ধর্ম তাতে নারী অবহেলিত, পুরুষ সর্বেসবা। তবে কবি এও বিশ্বাস করেন নারী কেবলমাত্র নিপীড়িতা এবং অনুগৃহীতা হয়েই থাকবে না, যুগের আবর্তনে সেও জেগে উঠবে। কারণ এ নারী কৃষ্ণরূপ মহাশক্তিমানের সখী। আঘাতে আঘাতেই ঘটবে তার জাগরণ। দিকে দিকে সেই শক্তিময় নারীর জাগরণ ধ্বনিত হচ্ছে। যুগের শঙ্খ উঠেছে বেজে।

বহুযুগান্তে গগনপ্রান্তে
যুগের শংখ বাজিছে ওকি?
তোমারে জাগাতে কে জ্বালে অনল
হে কৃষ্ণা, অয়ি কৃষ্ণ সখি!

যতীন্দ্রনাথ মূলত মানবতাবাদী কবি। সমাজের অনাচার বৈষম্যে ব্যথিত কবির মর্ম থেকে উঠে এসেছে বেদনার জয়গান। তাঁর বহু কবিতায় কখনো হালকাভাবে আবার কখনো তীক্ষ্ন ব্যঙ্গ, তির্যক বিদ্রূপের মধ্য দিয়ে শোষকগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ রূপায়িত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ী মনোভাব নিয়ে বিশ্বাস করেছেন সমাজের যে বঞ্চিত, সর্বহারা নিপীড়িত মানুষের দল যুগ যুগ ধরে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও নিষ্ঠুরতা সহ্য করে আসছে একদিন আবর্তের পর আবর্ত রচনা করে এমন এক শঙ্খধ্বনি জাগাবে, যে ধ্বনিতে অগণিত ভাষাহীন, মৌনমুখ বঞ্চিতদের বিদ্রোহের ধ্বনি বেজে উঠবে।

বিদ্যুৎসম মনে পড়ে মম
মন্থনদিন প্রলয়ে
নীলকণ্ঠের অট্টহাস্যে
উঠেছিনু আমি শংখ,
অসংখ্য মূক শঙ্কিতে করি’
মুখরিত নিঃশঙ্ক।

কিংবা

আগুনের তাপে সাঁড়াশির চাপে আমি চির নিরুপায়,
তবু সগর্বে ভুলিনি ফিরাতে প্রতি হাতুড়ির ঘায়।
যাহা অন্যায়, হোকনা প্রবল, করিয়াছি প্রতিবাদ;
আমার বুকের কোমল অংশ, কে বলিল তাহে খাদ?

তবে যতীন্দ্রনাথ শুধু শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতির জন্য, আগেই উল্লেখ করেছি, স্বয়ং বিধাতাকেও দায়ী করেছেন এবং সর্বোপরি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছেন।

শুনহ মানুষ ভাই!
সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ, স্রষ্টা আছে বা নাই।

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তকে বাংলা কাব্যজগতে মূলত দুঃখবাদী কবি হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু এ কথাও ভুললে চলবে না, কবি যতই দুঃখবাদী হন না কেন, তিনি মানবতাবাদী। সামাজিক অসঙ্গতি এবং মানবতাবোধই তাঁকে দুঃখবোধে জাগ্রত করেছে।
শ্রীকনক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এই দুঃখবাদ কবির বিলাসমাত্র নহে, উহা তাঁহার মর্মমূল হইতে উৎসারিত, পৃথিবী ও জীবনের প্রতি গভীর মমতাই তাঁহাকে দুঃখের কবি করিয়া তুলিয়াছে। ইহা জীবনের দুঃখ হইতে পলায়ন নহে, দুঃখময় জীবনকে গভীররূপে উপলব্ধি করিবার সাধনা ।”
মানব এবং মানবজমীনের প্রতি আকর্ষণ ছিল বলেই অসঙ্গতিগুলো তাঁকে বেদনা দিয়েছে। সেই বেদনার মর্মমূল থেকেই জাগ্রত তাঁর দুঃখবোধ। সুকুমার সেন তাই বলেছেন, “দুঃখের ফ্রেমে বাঁধা হইলেও জীবনচিত্রের উজ্জ্বলতা তাঁহার কাছে কিছু কম কমনীয় নয় ।”