গলার ডান দিকে জড়ুলটা আগে কোথায় দেখেছি। এই কথাটা মাথার ভিতর ঘুরছে অনুপমের। কেমন একটা অস্বস্তি লেগেই রয়েছে, মাছের কাঁটা ফোটার মতো, চলে গেলেও একটা খচখচানি থেকে যায়, যেন এখনো রয়েছে। অনুপম কিছুতেই মনে করতে পারছিল না এঁকে কোথায় দেখেছে।

শুভদীপ মৈত্র
শুভদীপ মৈত্র

এঁকে বলতে তার নতুন বস, অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট-এ এসেছে। বছর পঞ্চান্নর ফর্সা লোকটি, মুখটা একটু লালচে, ডিম্বাকৃতি, মাথার চুল পাতলা হয়ে আসছে এবং কাঁচা পাকা, কিন্তু পরিপাটি করে আঁচড়ানো বাম দিক থেকে ডান দিক। স্যুট পরে বসে ছিলেন অফিসে, প্রথম দিন ওদের সঙ্গে জেনেরাল ইন্ট্রোডাকশন, সেই স্যুটের রঙটা অদ্ভুত লেগেছিল, সোনালী স্যুট পরে এর আগে অফিসে কাউকে অনুপম দেখেনি। কিন্তু এই সমস্ত চেহারার খুঁটিনাটি মিলিয়ে মিলিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করছিল, আগে কোনো ভাবে তার সঙ্গে এর পরিচয় হয়েছিল কি না। যদিও তার বসের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়নি তিনি আদৌ তাকে কোনোভাবে চিনতে পেরেছেন, বা আগে কোথাও দেখা হয়েছে।
অনুপমের স্মৃতি খারাপ নয়, সে যে হিসেব-নিকেশের বিভাগে কাজ করে তার দফতরে সেখানে ভুলও চলে না। যদিও তাকে শ্রুতিধর টাইপের কিছু বলছি না। নিতান্ত গেরস্ত বাঙালি ছেলে, অর্থাৎ মোটামুটি পড়াশোনা-চাকরি-বিয়ে ইত্যাদি সেরে সংসার জীবনে মত্ত। যাদবপুরে তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যেখানে তার মা ও বৌকে নিয়ে থাকে (বাবা গত হয়েছে ক’বছর)। চাকরিতে সে ভালই টিঁকে গেছে, ও খুব মারাত্মক কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার আছে মনে হয় না, অর্থাৎ জুকারবার্গ বা পুতিন কিছুই সে হতে চায় না। যদিও এসব নিয়ে খবর রাখতে সে খুবই ভালবাসে। স্নোডেন সম্পর্কে কত খবর তার কাছে রয়েছে, তা বন্ধুদের আড্ডায় শুনিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়।
এহেন অনুপমের মনে পড়বে না তা হয় না। দু’দিন পরেই, আই-পি-এল দেখে যখন ঘুমতে যাবে, বউ-এর পাশে শুয়ে তার নিজের বালিশ থেকে বউ-এর চুল সরাতে সরাতে মনে পড়ে গেল। এবং মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘সর্বনাশ’।
অনুপমের বউ ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। সে যে ঘুমের ভান করে আসলে ঘুমোয় না রোজ, সে যে বিরক্ত অনুপমের এই আই-পি-এল বিলাস নিয়ে, সেটা ধরা পরে গেল, কিন্তু অনুপমের সে দিকে হুঁশ নেই। সে তড়াক করে উঠে বসেছে খাটে, চুলের মধ্যে দিয়ে দু’চারবার ঘনঘন আঙুল চালাল। বউ প্রশ্ন করল, ‘কি ব্যাপার কী হয়েছে?’ এ প্রশ্নে সে তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতে গেল, কিন্তু তারপর চুপ করে গেল। বউ বিরক্ত হয়ে অন্যপাশে ফিরে গজগজ করে বলে উঠল, ‘ কি যে হয় তোমার, আবার নিশ্চয়ই এই খেলাটা নিয়ে মাথায় কিছু ঘুরছে, আপদ যত।’
এই কথা শুনলে অনুপম অন্যদিন ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করে, আর এটাও সত্যি সে বউকে ভালবাসে, পাক্কা আড়াই বছর প্রেম করে তাকে বিয়ে করেছে, আর এখনো যৌবন যায়নি চলে, কাজে কাজেই।
আজ কিন্তু সে অন্যমনস্ক। তার মনে পরেছে সে নতুন বসটিকে কোথায় দেখেছে। তার চেয়েও বড় কথা সে জানে তার বস কি।
পরের দিন সে আপিসে গিয়ে ঘাড় গুঁজে কাজ করে চলল। সহকর্মীরা একটু অবাক। এই আপিসে সে মোটামুটি পপুলার, হাসি ঠাট্টা আড্ডার মেজাজে কাজ করে। আজ সে চুপচাপ, জোর করে ভেবে চলেছে কাজ ছাড়া অন্য কিছু সে করবে না। বেশি কথাবার্তা বাড়িয়ে লাভ নেই, বিশেষ করে মুখ ফসকে বস-সম্পর্কে কিছু বেরিয়ে গেলে এবং তার উৎস হিসেবে যদি সে চিহ্নিত হয় তাহলে তার চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে, এবং সবচেয়ে বড় কথা সে কী উপায়ে জানল সেটা প্রকাশ পেয়ে গেলে আরো কেলেঙ্কারি। যদিও তার আরেকটা ভয় কাজ করছে, যদি অপরদিকের লোকটা চিনতে পারে তো কী হবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই আপিসের ক্যুবিকল-এ বসে সে এই সব ভেবে চলেছিল, যদিও বুঝতে পারেনি যে তার চোখ মাঝে মধ্যেই চলে যাচ্ছিল বসের ঘরের দিকে। ঘসা কাঁচের দরজা তার ফাঁকে একটুখানি স্বচ্ছতা। সেই স্বচ্ছতার ভিতর দিয়ে সে দেখার চেষ্টা করছিল ভদ্রলোক কী করছেন।
অনুপমকে তার সঙ্গে মুখোমুখি হতে হবে, সেটা সে জানে না তা নয়। আজ, কাল অথবা পরশু তার ডাক পরবেই, কোনো না কোনো কারণে। সে সেই মুহূর্তে কী করবে এ নিয়ে অস্বস্তিতে। অথচ এ কথা কাউকে বলাও যায় না। কিন্তু না বলেও তো উপায় নেই, সারা দিন গুমরনোর পর পাড়ায় ফিরে সে বন্ধুদের কাছে মুখ খুলল, তবে একটু ঘুরিয়ে। সে খুব আলগোছে প্রশ্ন করল ‘কারো বস হোমো হলে কী বিপদ বলতো?’
তার কথা শুনে চায়ের দোকানে সবাই হেসে উঠল। পাড়ায় একটা পার্কের ধারে চায়ের দোকানে সে আড্ডা দেয়, তার বাড়ির গলি থেকে পাঁচ মিনিটের দূরে। এই আড্ডার বন্ধুরা তার ছোটবেলার বন্ধু অফিস ফেরত বা কেউ স্কুলের চাকরি সেরে অথবা কেউ নেহাত বেকার, একটা অলস সান্ধ্য আড্ডা, যার কোনো নির্দিষ্ট সদস্য নেই, যে যখন পারে ঢুঁ মারে। ‘না সত্যি’ অনুপমের কথা শেষ না হতেই আরেকজন ফুট কাটে ‘আর লেসবো হলে?’ আবার হাসির হিড়িক লেগে যায়। অনুপম চায়ের গেলাসে ফুঁ দেয়, কথাটা এদের বলা যাবে না। কিন্তু আড্ডার মাঝে একটা বিষয় পরলে সে নিয়ে কিছু আলোচনা চলতেই থাকে।
‘জানবেই বা কী করে কে হোমো কে নয়, গায়ে তো আর লেখা থাকে না।’
‘বোঝা যায় বোঝা যায়,’ কালো চশমার আড়াল থাকে কেউ একটা বলে উঠল।
‘শালা তুইই বুঝিস,’ বলে স-এর দোষ চোখ টেপে।
‘লেসবো হলে বেশি চাপ, আমাদের অফিসে একটা মেয়ে আছে, হেব্বি পাছা, কিন্তু বাবা কাজে তো লাগবে না, বৃথাই ঘুরঘুর করা।’
আজকাল মেয়েগুলো যেন বেশি লেসবো হচ্ছে। ফ্যাশান, ফ্যাশান। তবে সেদিন নেট-এ যা দেখলাম না, এ দুটোকে ছেলেরা পেলে…’
‘কি ব্যাপার পম চুপ কেন রে,’ কালো চশমা জিজ্ঞেস করে।
‘ধুর তোরা একেবারে খিল্লি করে দিলি।’
‘তো কি করব, সালা রিসার্চ করব নাকি হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ, তা তোর এত ফুটছে কেন তোর বস হোমো নাকি?’ স-এর দোষ বলে ওঠে। অনুপম রেরে করে ওঠে ‘ধুর তোদের কিছু বলতে যাওয়াই ভুল হয়েছিল।
কালো চশমা হঠাৎ বলে ওঠে, ‘শোন ভাই এমনিও মারছে অমনিও মারছে, কাজেই সে যদি আরো বেশি কিছু মারে কী আর করা,’ এ কথায় আবার সবাই হেসে উঠল, এমনকি অনুপমও।
আড্ডা আস্তে আস্তে বিষয়ান্তরিত হল। মেঘ করছে, কাল বোশেখি আসতে পারে, কিন্তু তার আগে গুমোট করেছে, মেঘ করায় আকাশে শহরের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে কেমন কমলা গোলাপি মিশে ঘোলাটে রঙ। অনুপম আস্তে আস্তে বাড়ি ফেরার তোরজোড় করছে দেখে একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কি হবে নাকি আজ?’
‘ধুর এই মাঝ সপ্তাহে খেতে ভাল লাগে না, সকালে অফিস আছে,’ বলে অনুপম এড়িয়ে গেল। কে একটা হাসল, আসলে সবাই জানে ঘন ঘন মদ খাওয়াটা অনুপমের বউ পছন্দ করে না। তাই সে আজকাল মদের প্ল্যান হলেই পালাই পালাই করে।

অনুপম এর থেকে বেশি পাড়ার বন্ধুদের আর কিছু বলতে পারেনি। এরপর যেটা হল, সে নিজেই একটু ধন্দের মধ্যে পড়ে গেল। সত্যি ইনিই কী সেই ভদ্রলোক যাকে সে দেখেছিল। না হলেই তো ভাল হয়। পরের দু’দিন অফিসে তার সঙ্গে আলাদা করে কথা না হলেও, এক-দুবার সামনাসামনি পড়েছে, কফির কাগজের কাপ হাতে নিয়ে ভদ্রলোকের অফিসের ভিতর পায়চারি করা অভ্যাস বোধহয়, হয়তো একটু পা ছাড়িয়ে নিতে। আর তাঁর সেই হাঁটার পথটা অনুপমের ক্যুবিকলের পাশেই। ফলে চোখাচোখি হয়েছে, সে গুড আফটারনুন জানিয়েছে, বা বসও নড করেছে। কোথাও তো অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছে না। সত্যি ইনি তিনি তো। কিন্তু ওই মুখ ওই জড়ুল তো না চেনার কথা নয়।
বাড়িতে সে বউকে এখনো বলতে পারেনি। মিনি, তার বউ, খেয়াল করেছে সে আনমনা, কিন্তু প্রশ্ন করে উত্তর পায়নি। উশখুশ করছে অনুপম কিন্তু বলতে পারছে না। এই না বলার চাপ নিয়ে সে রবিবার দিন সন্ধ্যাবেলা যাদবপুর কফি হাউস-এ পৌঁছল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীপক সিগারেট টানছিল, ভিতরে প্রদীপরা গল্প করছে।
অনুপমকে দেখে প্রশ্ন করল দীপক, ‘কি ব্যাপার আজকাল আর এদিকে দেখি না বড়?’
সত্যিই সে কফি হাউজ-এ খুব বেশি আর আসে না। আগের কথা আলাদা, তখন বয়স কম ছিল, অনেক স্বপ্ন ছিল। দীপক ওর খুব ভাল বন্ধু, একসঙ্গে ব্যান্ড করেছিল কলেজ জীবনে। গান বাজনা করার স্বপ্ন দেখত তখন। এখনও দীপক টিঁকে আছে, আজকাল কাজটাজও পাচ্ছে। যদিও অনুপম সরে এসেছে অনেকদিন। দীপকের পরের প্রশ্নটা তাই সে একরকম এড়িয়েই গেল, ‘কী তুই কি গিটার বাজানোটাও ছেড়ে দিয়েছিস নাকি?’ সে একটা হ্যাঁ-না সূচক ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে এরা বটে, কিন্তু কীভাবে আসল কথাটা পাড়বে বুঝতে পারছিল না। তারপর সে একরকম জোর করেই বলে ফেলল কথাটা, যা সে এতদিন চেপে রেখেছিল।
‘আমার যে নতুন বস এসেছে অফিসে, সে গে’
দীপক ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল। ‘তাতে কি?’
‘তাতে কিছু নয়। তবু ওই আর কি…’
‘ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডে তো গে-দের ছড়াছড়ি। রিকি মার্টিন গে, এলটন জন গে, এমন তো কত আছে।’
‘সে তো জানি।’
‘তাহলে তোর কী সমস্যা, তুই হোমোফোবিক জানতাম না তো?’
poetryএইবার অনুপম কী বলবে বুঝতে পারল না। সত্যি কথাটা বলা আরো বিপদ। প্রমাণ হবে যে সে হোমোফোবিক যদিও সে এ বিষয় নিবে এতটা ভাবেনি, আর ঘটনাটাও ঘটেছিল বছর চারেক আগেই হবে বোধহয়। সে তাড়াতাড়ি বলল, ‘না হোমোফোবিক নয়, এমনিই বললাম আর কি।’
দুজনে মিলে হাউসের ভিতরে ঢুকল, বাঁ দিকের শেষের দিকে প্রদীপরা বসে, জানলার ধারে। সেখানে একটা চেয়ার জোগাড় করে এনে বসল। দীপক বলে উঠল, ‘অনুপমের বস গে।’ হইহই করে উঠল সবাই, একেক জনের একেক মন্তব্য, বিষয়টা প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাস থেকে তাদের পাড়ার মেসো এতটা বড় একটা প্রেক্ষিতে ঘুরতে লাগল। দীপক বা অনুপমদের এই আড্ডায় এটা সহজ কারণ এদের মধ্যে কেউ গে নয়। বিষয় যখন অপর তখন তা নিয়ে আলোচনা কঠিন নয়। অনুপমের হঠাৎ মনে হল, যদি এখানে কেউ থাকেন, হয়তো পাশের টেবিলের যে চশমা পড়া কোঁকড়া চুল মাঝবয়সী ভদ্রলোক বসে রয়েছেন চুপচাপ, কফি খাচ্ছেন আর হাতের বইটার পাতা উলটে যাচ্ছেন। ইনিও তো হতে পারেন। তার মনে হল এ আড্ডাটা না হলেই হতো। সে বলে উঠল, ‘দ্যাখ এ বিষয় নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভাল। আফটার অল অফিসের ব্যাপার।’
সে বাড়ির দিকে রওনা দিল। হেঁটে হেঁটেই ফিরবে ঠিক করল, মিনিট পনের লাগবে বড় জোর। ফেরার সময় মনে মনে ভাবছিল, বা বলা ভাল ঘটনা পরম্পরাগুলো সাজাচ্ছিল। ঠিক কী ঘটেছিল বছর চারেক আগে তা একেবারে স্পষ্ট মনে আছে তা নয়। সুজনকে পুজোর আগে গোলপার্কের কাছে একটা শৌচাগারে নাকি হোমোরা ধরেছিল। সে শৌচাগারে সে যখন পেচ্ছাপ করছে, একজন নাকি তার পিছনে হাত বুলিয়েছিল আর একজন তার দিকে তাকিয় ইঙ্গিতময় হেসেছিল। এখন অনুপম বুঝতে পারে, সেটা ধাপ্পা ছিল হয়ত।, শালা ও বোধহয় নিজেই হোমো, বিরক্ত হয় নিজের মনে বলে ওঠে অনুপম। এরপর সে আবার ভাবতে থাকে, আমরা রেগেই ছিলাম তখন। আমি আর মানস বোধহয় মদ খাচ্ছিলাম পঞ্চমীর দিন লেকের ওই রোলার ঠেক-এর পিছন দিকটায়। তখন প্রায় সাড়ে ন’টা, এই দিকটায় পুজোর ভিড় একটু কম। একটা কোণের দিকে বেঞ্চ এ একজন মাঝবয়সী বসে ছিল, সঙ্গে একটি তরুণ। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি। তারপর মদ খেতে খেতে মনে হল এদের কিছু চলছে, আমিই বলেছিলাম বোধহয়। মানস সঙ্গে সঙ্গে চিরবিরিয়ে উঠল, ‘এদের জন্য তিষ্ঠনো যায় না শহরে। শালা মগা, সুজনকে সেদিন কি হ্যারাস করেছিল,’ তারপর আমরা দেখলাম ভদ্রলোক ছেলেটার হাত ধরে বসলেন। এরপর ফিসফিস করে কিছু বলতে ছেলেটার কানের কাছে মুখ নামাতেই আমার চোখে পড়ল জড়ুলটা। সঙ্গে সঙ্গে মানস হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে গেল, ‘এই এখানে কী হচ্ছে, এই এসব কী,’ সে চিৎকার করে উঠতেই ভদ্রলোক ও ছেলেটা অপ্রস্তুত, তারা উঠে দু’জন দু’দিকে ছিটকে গেল। মানস তখনও লোকটির পিছনে হাঁটতে হাঁটতে বলে চলেছিল, ‘কী দাদা এসব কী? মেয়ে জুটছে না, না তাতে চলছে না,’ বলে কিছুটা তাড়া করার পর হেসে ওঠে। আমিও তার সঙ্গেই ছিলাম এবং মজাই হয়েছিল। তবে একা থাকলে বোধহয় এতটা অসভ্যতা করতাম না।
অনুপম এখন জানে সে ভুল করেছিল। এমন হোমোফোবিক বোধহয় সবাই থাকে কম বয়সে। বা সে এবিষয়ে কিছু জানতও না, সে জানত হোমোরা খারাপ, বা হাসির খোরাক। তাও আজকাল খবরের কাগজ পড়েটড়ে লোকের এ বিষয়ে ধারণা বদলাচ্ছে। তার কি বসের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ? এটা ভেবে তার কেমন অস্বস্তি বেড়ে গেল। আগে ভাগে ক্ষমা চেয়ে রাখলে যদি হঠাৎ চিনে ফেলার থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তাকেও কোনোভাবে ভদ্রলোক মার্ক করতে পারেন?
রাতে শোয়ার সময় মিনিকে জানাবে বিষয়টা, অনুপম ঠিক করল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, সে খাটের এক পাশে কাত হয়ে বসল। মিনি মুখে ক্রিম ঘষছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। অনুপম তাকে বলল, ‘জানো আমাদের যে নতুন বস এসেছেন তিনি না গে।’
মিনি মুখ না ঘুরিয়ে আয়নার ভিতর দিয়ে তাকাল তার দিকে, ‘তোমাদের অফিসে এসব ডিক্লেয়ার করতে হয় নাকি, কে কী?’
‘না, তা ঠিক নয়।’
‘তবে তিনি গে তা তিনি বললেন সবাইকে।’
‘না মানে আমি জানি।’
এবার মিনি ঘুরে তাকাল, ‘তুমি জান মানে, তোমায় তিনি বলেছেন, মানে অ্যাপ্রোচ করেছেন!’
‘কী বলছ পাগলের মত,’ অনুপম রেগে গেল। এ আবার কী নোংরা প্রশ্ন, তার মনে হল। মিনি কিন্তু হাসছে, ‘আজকাল বসেদের হাত থেকে ছেলেদেরও রক্ষে নেই দেখছি।’
‘ স্টপ ইট,’ অনুপম তাকে থামিয়ে বলতে শুরু করল ঘটনাটা। মিনি বিছানায় এসে বসে পুরোটা মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর বলল, ‘খুবই বাজে কাজ করেছ তোমার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। একা পেয়ে লোকটাকে যা করেছিলে তা তো টিজিং।’
অনুপম জানে না তা নয়। কিছু একটা তাকে করতেই হবে। কী হবে সেটা বুঝতে পারছিল না যদিও। হোমো সেক্সুয়াল বলে আলাদা করে কথা বলতে হয় কোনো ভাবে কী না জানা নেই। তার মনে পড়ল বই মেলায় লেসবিয়ান মেয়েদের একটা সংগঠন দেখেছিল। ভয়ঙ্কর অ্যারোগান্ট ও ঝগড়ুটে টাইপের তারা। সেটা হবেই দল বাঁধলে যতই প্রান্তিক হোক না কেন, একটা ক্ষমতার আস্ফালন তৈরি হয়, তখন কীভাবে নিপীড়িতও নিপীড়নের ভাষায় কথা বলে।
সোমবার অফিসে গিয়ে যাওয়ার সময় সে ঠিক করে নিল আজ সে একটা হেস্ত নেস্ত করবে। সেই জন্য সে আগে বেরল। মন ফুরফুরে, এইট বি বাস স্ট্যান্ড-এ এসে নিজের মনে গুনগুন করতে লাগল, এইট বি নিবেই একতা গান, অঞ্জন দত্তের বোধহয়। সে বেশ খুশি, আর একটা উত্তেজনাও রয়েছে।
এই উত্তেজনা স্থায়ী হল না। ক্রমশ বাস থামতে থামতে, রুটিন জ্যাম আর সিগনালে আটকে সল্ট লেক পৌছতে পৌছতে সেই উত্তেজনা কমে আসতে থাকল তার। অফিসে পৌঁছে দেখল খুব একটা আগে কিছু ঢুকতেও পারেনি। সে চুপচাপ নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। অফিসিয়াল মেল পড়ে আরো দমে গেল সে। কাজের ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে, কিন্তু মাইনে আপাতত বাড়বে না। তার চোখ বসের ঘরের দিকে গেল। উনি একটু পড়েই অফিসে আসবেন, এক কাপ কালো কফি চাইবেন ও সঙ্গে দুটো স্যান্ডুইচ। তারপর বাইরে বেরিয়ে এক দু চক্কর হেঁটে করিডরে আবার তিনি নিজের ঘরে ঢুকে যাবেন। আজ হয়তো অনুপমকে তাঁর সঙ্গে বসতে হবে কাজ নিয়ে। তখনি সে বিষয়টা তুলতে পারত। কিন্তু তুলবে না। অনুপম এইটুকু বুঝেছে এখন, হোমো হোক আর যাই হোক বস বসই। তাকে ঘাঁটাতে যাওয়ার চেষ্টাটাই হাস্যকর, বরং চেপে যাওয়াই ভাল।

                                                                                             অলংকরণ: হিরণ মিত্র