শাশ্বত কর
শাশ্বত কর

বাতাবি লেবুর মত মেঘ ঝুলছে। একটু একটু করে কালি মিশে যাচ্ছে ধূসর আকাশে। যেন মেঘকুমার ব্যাপনের পরীক্ষা করছেন আকাশিয়া বীক্ষণাগারে। হয়তো কোনো মেঘনাদ তার শিক্ষক। জলে পরা কালির ফোঁটার মত মেঘ চোঁয়াচ্ছে তার হাত থেকে।
হাওয়ায় খুব একটা জোর নেই। তবু মাঝে মাঝে ত্যারচা বৃষ্টি তীরের মত এসে ফুটছে গায়ে। জ্বলে যাচ্ছে গা! দূরে…ওই দূরে…আখের খেত পেরিয়ে, যেখানে রাস্তাটা আর দেখা যায় না, খেলনা গাড়ির মত আসল গাড়িরা হুউউস করে ছুটে যায়- সেখানটায় ধোঁয়ার মত বৃষ্টি হচ্ছে। এই হল বর্ষার মজা। এই আছে তো এই নেই, আবার এখানে আছে তো ওখানে নেই! মেঘবালকের খামখেয়াল।
আমরা বেরিয়ে এসেছি পরমেশদার সাথে। পরমেশদা অনেকটা সেই অনুবাত ঢালের মত। মেঘ এসে সরাসরি ধাক্কাবেই..উপরে উঠবে…আর তার পর নিজেকে নিংড়ে বুক ভরা জল উজাড় করে দেবে। দু একদিন টানা বৃষ্টি হলেই পরমেশদা আর বসতে পারেন না। বেরিয়ে পড়েন।
সত্যি! এ লোকটার আজীবন বর্ষা। যত মিশেছি, তত বুঝেছি এমন ফাটাকপালে লোক বাংলায় বোধ হয় আর নেই। থাকলেও হাতে গোণা। জন্ম, বাড় বৃদ্ধি, তারুণ্য, প্রেম সবখানে শুধু বর্ষা আর বর্ষা! সূর্য যে একেবারে ওঠেনি তা নয়, তবে সেও ওই বর্ষার লো ভোল্টেজি সূর্য!
পরমেশদার সাথে আমার আলাপও বৃষ্টিদিনেই। বৃষ্টি বলে বৃষ্টি! ‘উতল ধারা বাদল’ ঝরছে তো ঝরছেই। নেহাত এম.সি।র দরকারি মিটিং ছিল, তাই আসা। নইলে এই বৃষ্টিতে প্যাচপেঁচে বাস ঠেঙিয়ে এদ্দুর আমি আসতাম না। আমি তখন থাকি মফস্বলে। আর কাজ কোতোলপুর গ্রামে। গ্রাম তো গ্রামই। মাইলকে মাইল ধ্যাদ্ধেড়ে মাঠের বুক চেরা পিচরাস্তার শেষে একটা শাল বন। তার দুই ধারে দুই পাকা বিল্ডিং। ছোটোটা কোতলপুর ফাঁড়ি আর বড়টা আমাদের ইশকুল। মহেশতলা থেকে ভ্যানে আসতে হয়।
ইশকুল থেকে যসেদিন বেরিয়ে বুঝলুম কপাল ফাটা। ভ্যানের আশা ছেড়ে এগোলাম। দু ধারের মাঠ মনে হচ্ছে দহ। দূরের বন্দু বিন্দু গ্রামগুলোর কী দশা কে জানে! জানতে অবশ্য দেরি হল না। কারণ খানিক এগিয়েই দেখলাম রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। আর সেই জলের উপর দিয়ে মুখে ডিম নেওয়া কালো পিঁপড়ের মত পিলপিল করে এগিয়ে আসছে সারসার মানুষ! একটা ছেলে এসে বলল, ‘ স্যার! আজ আর যেতে পারবেন না। বাস বন্ধ। রাস্তায় জল বইছে!’ গতিক সেরকমই। কাজেই ফিরে চললুম ইশকুলে। ইশকুলে ঢুকেই হেড মাস্টারের ঘরে গেলুম। সেখানে দেখি আর এক জন লোক! ঢোলা পাৎলুন, ঝোলা ব্যাগ। কাঁচায় পাকায় মেশা চুল দাড়িতে অযত্ন, অথচ গায়ের রঙ ফটফটে। সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম ছাপ আছে, যা গাঁ ঘরে বড় একটা চোখে আসে না।
rain-1এইচ.এম. বললেন, ‘আটকে পড়লেন বোধহয় অনিলবাবু! দেখুন তো কী অবস্থা! একে ঝরেই চলেছে, তায় বলা নেই কওয়া নেই ড্যাম থেকে জল ছেড়েছে! দু দুটো ব্লক পুরো ভেসে গেল!’
বললুম, ‘কিন্তু ব্যারেজ তো অনেক দূর! সেখানে জল ছাড়লে এখানে জমবে কেন?’
‘ আমিও তো সে কথাটাই বলছি আপনাকে’, ভদ্রলোক বললেন। এইচ. এম. অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘ এ আপনাদের কেমন কথা! জল ছাড়লে নদী বেয়ে তা এখানে আসবে না!’
‘ কিন্তু বাঁধ ঠিক থাকলে তো চিন্তার ছিল না। সেই বাঁধই তো গলে গেছে। আপনাদের তো কতবার বলে গেছি। কেবল এ ওর ঘাড়ে ঠেলছেন। আপনি চিঠি লিখছেন, শ্যামা পার্টি দ্যাখাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু নেই’
‘ ভাগের মা যখন, বার জনকে তো জানাতেই হবে। এতে আর রুলিং পার্টির দোষটা কোথায় বলুন?’
‘ দোষগুণের কথা আমি আর বলছি না। বলছি আশু সমাধানের কথা। গাঁয়ের অনেক ঘর ভেসেছে, যা গতিক আরও ভাসবে, মানুষ গুলোকে তো আপাতত আশ্রয় দিতে হবে! তাই পোস্টাপিসকেও বলেছি, ব্যাঙ্ককেও বলে এলুম। এবার আপনার ইশকুলটা চাই’
‘এখানে আর কজন থাকতে পারবে!’
‘ কেন? আপনার ঘরটা বাদ দিয়েমোট ছাব্বিশটা ঘর। ঘরে দশজন থেকে পনেরো জন থাকলে অনেকে বাঁচবে!’
‘ এতজন! এক ঘরে!’
‘ আরে জান তো বাঁচবে! আপনি রাজি হয়ে যান। আমি বাহাদুরকে নিয়ে ব্যবস্থা দেখি’।
‘ স্টাফরুমটা বাদ রাখলে হয় না?’ বললুম।
‘ আপনাদের চেয়ার টেবিলগুলো আলমারির দিকে ঠেলে দেব। কেউ কিছুতে হাত দেবে না। ওদের ছেলে মেয়েরাই তো এখানে পড়ে! চিন্তা নেই’।
‘ কিন্তু, আমি তো একা নই’, এইচ.এম. বললেন, ‘ম্যানেজিং কমিটি…সেক্রেটারি..’
‘ রাজুদা তো আপনাদের সেক্রেটারি? ও আমি কথা বলে নেব। উনি আমার কথা ফেলেন না। আপনি রাজি হয়ে যান’।
এইচ.এম. আমার দিকে চাইলেন। ‘ কী বলি বলুন তো অনিলবাবু? আপনিও তো এম.সি. মেম্বার!’
‘ কী বলি! এখন তো আর কেউই নেই যাদের সাথে কথা বলা যায়।’
‘ কিন্তু লোকগুলোকে তো আর আলোচনা পর্যন্ত ভিজতে দেওয়া যায় না স্যার’ ভদ্রলোক বললেন।
‘ না পরমেশবাবু’, এইচ.এম.ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘আপনি বরং থানায় যান’
কথাটা আমার ভাল লাগলো না। বললুম, ‘ কিন্তু স্যার, লোকগুলোর অবস্থা তো সত্যিই খারাপ। আস্র সময় আমিও দেখলুম’।
‘ সে তো আর আমি করিনি। প্রশাসনের কাজ প্রশাসনই দেখুন। ওরা আমায় বললে আমি নিশ্চয়ই ছেড়ে দেব। কিন্তু এভাবে রাজি হওয়া যায় না’
‘ না মাস্টামশাই’, লোকটা দৃঢ় গলায় বলল, ‘লোকগুলো এখানেই ঢুকুক। আপনি বরং বাড়ি ফেরার পথে থানায় আমার নামে একটা নালিশ ঠুকে যান। ওতেই কাজ মিটে যাবে’
‘ এ তো আপনার রাগের কথা। আপনিও একটু বুঝুন। এতগুলো লোক! কদিন থাকবে ঠিক নেই!ইশকুলের পড়াশুনো!’
‘ কে আসবে পড়তে? যারা পড়ে দেখবেন তারাই বাবা  মা ভাই বোন নিয়ে এসে উঠছে। প্রাণ বাঁচলে তো পড়াশুনো! যাক আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি বাহাদুরকে ওর মেতের বিরুদ্ধেই নিলাম। দেখবেন, ওকে আবার শোকজ ধরাবেন না যেন!’
কথাগুলো বলেই লোকটি উঠে পড়ল। হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে ধাঁ করে বেরিয়ে গেল। বাইরে আওয়াজ পেলুম, ‘এ বাহাদুর!’
বললুম, ‘লোকটাকি রাজনীতির?’
এইচ.এম. বললেন, ‘ না না। ইনি হলেন নীতি পরায়ণ লোক। রাজনীতির হলে তো হয় আমার পক্ষে নয় বিরোধীতে থাকত। সামলে নিতুম। কিন্তু এ কোন পক্ষে নেই। বনেদি বাড়ি। কাকা জ্যাঠা দাদা ভাই সবাই হোমড়া চোমড়া। সবকলকাতায় নয় তো বিদেশে। একমাত্র ইনিই বাড়ি আগলে পড়ে আছেন। উচ্চ শিক্ষিত। জে.এন.ইউ.র স্কলার। কিন্তু দেখুন, চাষাভুষো আঁকড়ে বসে আছে। আর বৃষ্টি ওর এক বাতিক। এই যে দেখলেন, এমন আবদার প্রতিবারই নিয়ে প্রায় আসে। সে ম্যানেজ দেওয়াও যায়। এবার গেল না’
‘ হুঁ। অনিন্দ্যর কাছে শুনেছি বোধ হয়’
অনিন্দ্য আমার বন্ধু। ওর সাথে মিউচুয়াল এখানে ট্রান্সফারে এসেছি বছর দুই।
‘ ঠিকই শুনেছেন। আসলে এবছরের ব্যাপারটা সত্যিই চিন্তার বটে। কিন্তু, আপনি ফিরে এলেন যে!’
‘ বাস বন্ধ। কোতোলপুরের কাছে রাস্তা ভেসে গেছে’।
‘ সেকি! তা হলে!’

দূরের বন্দু বিন্দু গ্রামগুলোর কী দশা কে জানে! জানতে অবশ্য দেরি হল না। কারণ খানিক এগিয়েই দেখলাম রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। আর সেই জলের উপর দিয়ে মুখে ডিম নেওয়া কালো পিঁপড়ের মত পিলপিল করে এগিয়ে আসছে সারসার মানুষ!

‘ তাহলে আর কী! শরণার্থীরা তো আর এই ঘরে থাকবে না। আমি নয় দু একটা দিন এ ঘরেই থেকে যাব’।
‘ খেপেছেন? ওরা একবেলা থাকলেই আর গন্ধে টিকতে পারবেন ভেবেছেন? তা ছাড়া খাওয়া দাওয়া! দাঁড়ান, ব্যবস্থা করছি’।
বলেই বেরিয়ে গেলেন। আমিও বেরোলাম। এইচ.এম. ডাকছেন, ‘ও পরমেশবাবু, শুনে যান’
পরমেশবাবুর কোলে তখন কার একটা বাচ্চা। ব্যালকনিতে বাহাদুরকে কী যেন বোঝাচ্ছেন। ডাকশুনে বাচ্চাটাকে পাশের ঘরে ছেড়ে দিয়ে নেমে এলেন। একগাল হেসে বললেন, ‘ বাহাদুরকে সব বুঝিয়ে দিলাম। দুটো ঘর ভরে গেছে। আরও আসছে’।
‘ সে তো হল। এবার এর জন্যে একটু দেখুন। ইনি আমাদের ইতিহাসের শিক্ষক। শহরে থাকেন। আটকা পড়ে গেছেন। আম্র ঘরেই নিয়ে যেতাম। কিন্তু সেখানে এতক্ষণে নিশ্চই ভরে গেছে। আপনার সাথে নিয়ে যান না’
‘ আমার ওখানে এমনিতে তো কোন অসুবিধে নেই, কেবল..’
‘ আরে উনি ওসব কিছু মানেন না, আধুনিক মানুষ’
বোধহয় জাতপাতের কথা ভাবছেন। আমি খাঁটি ব্রাহ্মণসন্তান হতে পারি, তবে হোস্টেল মেসে থাকার সুবাদে ছুঁৎমার্গ উঠে গেছে। বললুম, ‘আরে, ওসব কেউ মানে না কি আজকাল?’
পরমেশবাবু একটু তাকিয়ে বললেন, ‘ ভেবে বলছেন তো?’
বললুম, ‘এতে আবার ভাববার কী!’
‘ বেশ, তবে চলুন’
এইচ. এম.আমার হাতটা ধরে একটু পাশে টেনে নিয়ে বললেন, ‘দেখলেন কেমন ম্যানেজ হয়ে গেল। যাকগে, পৈতে পরেন তো?’
‘ হঠাৎ?’
‘ এমনি। বলুন না!’
‘ পরি’
‘ ওতেই হবে’
‘ কী হবে!’
‘ কিছু না। গ্রাম গঞ্জ। বর্ষার রাত। তাই বললাম’
‘ বর্ষার সাথে পৈতের কী সম্পর্ক?’
‘ কিছুই না। শুনুন, রাতে কেউ ডাকলে যেন যাবেন না’
‘ কে ডাকবে?’
‘ যে কেউ ডাকতে পারে। এই ধরুণ না, আমিও ডাকতে পারি। কিন্তু আপনি যাবেন না। কেমন?’
‘ কেন ডাকবে?’
‘ সে কারণ বলা যায় না। যে কারণেই হোক, সাড়া না দিলেই হল’
এ তো বেশ গেরো। ‘কী ব্যাপার বলুন তো? ভূতের বাড়িতে পাঠাচ্ছেন না কি?’
‘ ছি ছি! ও কথা বলে না। ফাঁকা বাড়ি কি না, তাই বলছিলাম’।
পরমেশবাবু এবার এসে বললেন, ‘রেডি তো! তবে চলুন’
ওর সাথে বেরোলাম যখন, ব্যালকনি থেকে বাহাদুর হাঁ করে আমায় দেখছে।
বাইরে একটা রাজদূত। ঢোকার সময় দেখেছি কি? মনে করতে পারলাম না। পরমেশবাবু স্টার্ট দিলেন। দুম দুম দুম দুম শব্দ ফুটল। ‘ কই বসুন’
বাইক ছুটল। জল সরে সরে যাচ্ছে। ছিটে আসছে পায়ে। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা! মাঠ ঘাট সব এক। কেবল গাছ দেখে বোঝা যাচ্ছে ওখানে মাঠ। পরমেশবাবু বুঝলুম জায়গাগুলো হাতের রেখার মত চেনেন। স্বাভাবিক গতিতে তাই বাইক ছুটছে। জল বলে আলাদা সমীহ করা নেই। জল সমুদ্রে বাইক নৌকোয় আমি আর পরমেশবাবু। দারুণ লাগছে!
হাওয়ায় ফুলের পাঁপড়ির মত ঝুরো বৃষ্টি মুখে এসে লাগছে। কাদের যেন আমবাগান মেঘ হয়ে আছে। ছায়া ঘনাইছে বনে বনে/ গগনে গগনে ডাকে দেয়া। কীভাবে যে লিখে গেলেন এতসব অনুভব! যখন যাই দেখি, ঠিক তার জন্যেই যুৎসই গান! ভারি আশ্চর্য লাগে!
‘ এসে গেছি আমরা’।
ছিটকে তাকিয়ে দেখি বড়সড় একটা গেট। গ্রিলের দু ইঞ্চি উপর দিয়ে জল বইছে। জল বয়ে নেমে যাচ্ছে দু’পাশের মাঠে। মাঠে শালুক ফুটে আছে। বাবলার গাছ। পরমেশবাবু ঝুঁকে গ্রিল খুললেন। জলে ডোবা ইঁটের রাস্তা ধরে রাজদূত এগোল।
রাজবাড়িটি দোতলা। ঠাট্টা নয়। বেশ বড় বাড়ি। গাঁ ঘরে এমন বাড়ি চট করে চোখে আসে না। চারপাশ ভিজে বিষণ্ণ। গাছের গা বেয়ে জলের স্রোত।
নামতে গিয়ে দোতলায় চোখ পড়ল। লোলচর্ম এক বৃদ্ধা আমাদের দিকে চেয়ে আছেন জানালা দিয়ে।
‘ আপনার মা?’
‘ মা! কোথায়?’
‘ ওই তো উপরে…!’ দেখাতে গিয়েই চমকালাম! কেউই নেই। জানালাও বন্ধ!
‘ আসুন’
তালা খুলে ভিতরে ডাকলেন পরমেশবাবু। বললেন, ‘ এখন আমি একাই। স্বপাক খাই। পুজোর সময় আরও অন্যেরা আসে।‘
‘ আপনি কি বেরোবেন আবার?’
‘ নাঃ! অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। এখন আর বেরোব না। বাহাদুরকে তো বুঝিয়ে এসেছি’। দরজায় তালা লাগাতে লাগাতে বললেন, ‘ চলুন, আপনাকে থাকার ঘরটা দেখিয়ে দিই’
‘ আবার আলাদা ঘর কেন? আপনার ঘরেই তো হয়ে যেত’
‘ উঁহু! ও ঘরে ঢোকার ছাড়পত্র এত সহজে মেলে না!’
‘ মানে? অনেক পারিবারিক দামি জিনিস আছে বুঝি? আমাকে শেষে চোর ঠাওরালেন?’
‘ ছি, ছি! এ কী কথা! তা নয়’।
‘ তবে?’
‘ ও কিছু নয়। আপনি নিচেই থাকুন। আমি উপরে কোণার ঘরে আছি’
গৃহকর্তার কথাই মেনে নিলাম। ঘরটা তাছাড়া বেশ বড়ই। কোণের আলমারিটা দেখিয়ে পরমেশ বললেন, ‘ ওখানে জামা কাপড় আছে। চেঞ্জ করে বসার ঘরে আসুন। আমি চা বানাই। বললাম, ‘না, না! আমি বেশ আছি। জামা কাপড় লাগবে না’। কিন্তু কে শোনে? তিনি তার কথা বলে বেরিয়ে গেছেন।
আলমারিটা খুলতেই পুরোনো মাটির গন্ধ বেরিয়ে এল। পুরোনো বাড়ি, তায় বর্ষা। ড্যাম্প হয়ে আছে। একটা হলুদ পাঞ্জাবী আর পাজামা বের করে পরে নিলাম।
rain-2রাতের খাওয়া বেশ ভালোই। দারুণ রাঁধেন ভদ্রলোক। ভুণা খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা। এই বর্ষায় একেবারে ফাস্ক্লাস! খাইয়ে দাইয়ে টেবিলে ল্যাম্পটা রেখে উনি শুতে চলে গেলেন। গোটা নিচ তলায় আমি একা!
অবশ্য তাতে আমার কিছু যায় আসে না। একা থাকতে আমি পছন্দই করি। সিগারেট ধরিয়ে একবার বসার ঘরের জানালা দিয়ে দেখলাম। জল আর একটু বেড়েছে। ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম। বৃষ্টি আর ঝিঁঝিঁর যুগলবন্দি শুনতে শুনতে ঘুম এসে গেল। ঘুম ভাঙল জলের শব্দে। তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। কখন এত জল উঠে এসেছে! আর ইঞ্চি খানেক উঠলেই তো খাটে উঠবে! নাঃ, উপরে যেতে হবে।
ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নেমে পড়লুম। উফ! কী ঠান্ডা! হাড় জমে যায়! ল্যাম্পটা নিলাম টেবিল থেকে। বেরিয়ে সিঁড়ির নিচ থেকে চেঁচিয়ে ডাকলুম, ‘পরমেশবাবু?’
উত্তর নেই। সিঁড়িরও চারধাও জলের তলায়। উঠি। একধাপ উঠতেই ল্যাম্পটা ফতফতিয়ে নিভল! অমনি একটা অন্ধকার যেন ঢুকে পড়ল আমার ভিতরে। চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘পরমেশবাবু!’
সাড়া নেই। ধড় মড় করে উপরে উঠলাম। ল্যাণ্ডিং। ল্যাণ্ডিং পেরিয়ে আর একটা টার্ন। উঠে এলাম। লম্বা করিডোর। ডান পাশে গেলাম। একটা হলঘর। হলঘরের সোজাসুজি চওড়া জানালা। জানালার সামনে একটা আর্ম চেয়ার। তাতে আবছা আলোয় একজন বৃদ্ধা! পরমেশবাবু তখন কেউ নেই বললেন কেন?
আমার পায়ের আওয়াজে বোধ হয় উনি সচকিত হয়ে থাকবেন। আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘পরম! এলি রে বাবা! কবে থেকে জানালায় বসে আছি! জল বাড়ে। আর আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দেয়। তুই কোথায় গেছিলি রে বাবা?’
উত্তর দিলুম না। উনি বললেন, ‘ তোর দাদার বাড়িতেও জল ঢুকেছে, না রে? আমার ছেলেগুলোর কী হবে? মেজটা তো সাঁতার জানে না! ও পরম এখানে আয় বাপ!’
মন্ত্রমুগ্ধের মত এগোলাম। আঃ! শীতল পরশ! আঙুল! না কি বৃষ্টি ভেজা ডাল! কতগুলো হাড় যেন মাথায় বিলি কাটছে! স্নেহের ছোঁয়ায় চোখ বুজে আসছে…
কোথাও বাজ পড়ল! চমকে তাকিয়ে দেখি কোথায় কী? আর্ম চেয়ারে কেবল একটা শাদা কাপড় গুটলিয়ে পড়ে! কী যেন চাপা দেওয়া!
‘ পরমেশদা!’ চেঁচিয়ে দৌড়লাম কোণার ঘরটার দিকে। সেখানে আলো জ্বলছে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখি, আরে এ কোন জায়গা! এত আলো কোত্থেকে! ধু ধু মাঠ! কেবল বটের তলায় চার জন। তাস চলছে।
পরমেশদা হেসে বললেন, ‘ ঢোকার ছাড়পত্র নিয়েই নিলে! এস। পরিচয় করিয়ে দিই’। আমায় দেখিয়ে বললেন, ‘ ইনি গোয়াবাড়ি নেতাজীর ইতিহাসের মাস্টামসাই অনিল চক্রবর্তী। ইনি অমলেশ গুহ, ও চিন্ময় আর এ হল নীলমাধব গুহ। কেবল আপনিই এদের আসল নাম জানলেন। বাইরের মানুষরা ওদের অন্য অন্য নামে জানে।‘
‘কেন?’
‘ বা রে! আমরা যে বিপ্লবী। নাম বদলানো তো আমাদের রক্তে’
সেই থেকে পাঁচজন আছি। দিব্য জীবন! দুপুরে ইশকুলে যাই। ছেলে পড়াই। রাতে ঘরে ঢুকে মাঠে তাস খেলি। কেবল আকাশে মেঘ এলেই আর ঘরে থাকতে পারি না। বেরিয়ে পড়ি। মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াই। কোথায় কে বর্ষায় আটকা পড়ে আছে কে জানে? তাকে কোনও একতা পথে তো আনতেই হবে।
অন্ধকারে দেখি জলে জল মিশে যায়। জোনাকির আলোয় জল মিশে যায়, চেয়ে চেয়ে দেখি। কেবল দূর থেকে হাইওয়েতে গাড়ি যেতে দেখলেই মনটা হু হু করে ওঠে। বৃষ্টির ফোঁটা তখন গায়ে জ্বালা ধরায়!
যেমন এখন লাগছে। পরমেশদা বলছে, ‘ অনিল! কষ্ট হচ্ছে?’
অমলেশ গান ধরেছে, ‘বন্ধু রহ রহ সাথে’
হাওয়ায় মিশে যেতে যেতে বললাম, ‘ নাঃ! ইনহেলারটা টেনে নিয়েছি। কষ্ট হাওয়া’!