sa11শিল্পীর কোনো দেশ–কাল–সীমানা নেই। একটি দেশের আর সব জনসাধারণ থেকে শিল্পীবৃন্দ ঠিক এই জায়গাতেই একটা পৃথক অবস্থান নিয়ে বসবাস করেন। কারণ, খোদ শিল্পকর্মই আন্তর্জাতিক, সর্বজনীন। শিল্পী তার শিল্পকর্ম দিয়ে শুধু নিজেকেই আনন্দ দেন না, তার পরিপার্শ্বিক সবাইকে আনন্দ প্রদান করেন আর এটাই শিল্পের মৌলিক ধর্ম।

ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য
ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই আমরা লক্ষ্য করেছি,বিশেষ রাজনৈতিক দলের তকমা ছাড়া এই দেশে খুব কম শিল্পী নিজেকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন বা পারছেন। এটা যেন একটা রীতি বা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে অশিল্পীরা শিল্পী হয়ে ওঠেন, উঠছেন এবং প্রকৃত শিল্পীরা থাকছেন অবহেলিত। এতে করে শিল্প রক্ষা নয় তার ধ্বংসই ডেকে আনা হয়। আর শিল্পকর্ম ট্রেনের সিট দখলের মতো কোনো বিষয় না, যে দখলদারিত্বের  মাধ্যমে জনগণের মন জয় করে নেওয়া যাবে। দর্শক–শ্রোতা ঠিক ঠিক তার পছন্দের শিল্পীকে চিনে নিতে জানেন। আমাদের দেশে এখনো ভালো শিল্পী–সাহিত্যিকের বড় অভাব। সেখানে কোনো শিল্পী যদি তার মেধা দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, তাকে লালন করাই আমাদের কাজ। শিল্পী তার কাজ থেকে সরে গেলে বা তাকে সরানো হলে তা আত্মহননের সামিল হয়ে দাঁড়ায়। শিল্পকর্মে নিয়োজিত এমনকি সাধারণ যেকোনো কর্মীও তার কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন না, শিল্পকর্মীরা তো নয়–ই। কর্মহীন মানুষ নিস্তেজ মানুষে রূপান্তরিত হয়ে পড়েন।

যেকোনো শিল্পী, তা তিনি যে কোনো দল বা মত বা আদর্শের হোন না কেনো, তার শিল্পকর্ম থেকে তাকে বিরত রাখার অধিকার আমাদের কারো নেই – মূলত এই উদ্দেশ্যেই এই লেখা। তাছাড়া কোনো শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ খুব ভালো ফল নিয়ে আসেনা। শিল্পী তার মেধা দিয়ে ঠিক ঠিক উতরে যান। উতরে যাবার অসংখ্য উদহারণও আছে। নাৎসি সময়ে বার্টল্ট ব্রেখটকে নানা দেশে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিলো। জাফর পানাহিকে ইরান সরকার গৃহবন্দী করেছেন। কিন্তু তাতে করে জাফর পানাহির ছবি নির্মাণ স্তব্ধ হয়ে যায়নি। ঘরে বসেই তিনি দুটো ছবি (২০১১ তে নির্মাণ করেন, “ দিস ইজ নট এ ফিল্ম ” এবং ২০১৩ তে “ ক্লোজ কার্টেন ”) নির্মাণ করেছেন। মকবুল ফিদা হোসেনকে দেশ ছাড়া হতে হয়েছিলো, কিন্তু তার মেধার ঘাটতি ঘটেনি। একজন শিল্পী এবং সাহিত্যিকের প্রধান পুঁজি তার দর্শক–শ্রোতা–পাঠক। এই পুঁজিকে অতিক্রম করার সাধ্য কারোর নেই। শ্রোতা চাইলে শিল্পীর স্থানিক অবস্থান যেখানেই থাক না কেনো তারা তার কন্ঠ শুনবেনই। কাজেই শিল্পের প্রতিরোধ নয়, স্বাধীনতা ও প্রগতি আমাদের কাম্য।