mother

সুনির্মল দাস
সুনির্মল দাস

ভাড়াটে মায়েদের দিন শেষ। মাতৃত্ব ও গর্ভধারনের যুগলবন্দী দেখতে চায় আমাদের সরকার। ভারতীয় সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সারোগেসি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর মোদী-কোম্পানি। ভারতীয় সংস্কৃতিকে বোঝার কোনো মেড-ইজি মোদিজীর কাছে আছে কিনা জানি না, তবে মাঝে ভারতীয়ত্বের সাথে সঙ্গতি কিংবা অসঙ্গতির জিগির তুলে নিজেদের হিডেন এজেন্ডা রূপায়নে যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছেন তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক নিশ্চয়ই কোনো মুশকিল আসান রয়েছে আমাদের বর্তমান সরকারের কাছে। তা নইলে, এত সহজে, একটুও না তোতলিয়ে পটাপট কোনটা ভারতীয় আর কোনটা অ-ভারতীয় তা বলে দেওয়া বেশ শক্ত কাজ (অসম্ভবও হতে পারে!)। খুব জটিল সমস্যাগুলির ক্ষেত্রে আমাদের নেতারা নিদেনপক্ষে স্বপ্নাদেশ পান বোধহয়। কথায় আছে ‘যা নেই ভারতে তা নেই (মহা)ভারতে’। আমাদের হিন্দু নেতারা যদি সারোগেসি, মাতৃত্ব, জরায়ুভাড়া, আইভিএফ প্রভৃতি নিয়ে মহাভারতে কোনো সূত্র রয়েছে কিনা তার খোঁজ করতেন তাহলে আখেরে লাভই হতো। সে নাহয় ‘সবই ব্যাদে আছে’ গোচের কিছু অলটপকা মন্তব্য শুনতে হতো। তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানের  এই উচ্চতর প্রযুক্তির চর্চাটা অন্তত জারি থাকতো, বেশ কিছু মানুষের ইচ্ছেপুরণ হতো এবং অনেকের জীবিকা নির্বাহ হতো। ২০১২ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতের প্রায় ৩০০০ ফার্টিলিটি ক্লিনিকে কেবলমাত্র সারোগেসি থেকে আয় বছরে চল্লিশ কোটি ডলার। সারোগেসি বিষয়টি  সম্পর্কে ইতিমধ্যে সবাই কমবেশি জেনে গেছে। গতমাসের শেষের দিকে এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। আমি এই প্রবন্ধে  মূলত মাতৃত্বের বিপনণ ও সারোগেসির মধ্যে যে ভিন্নতা তা নিয়ে বলবার চেষ্টা করব। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের হাত ধরে মানুষ অনেক অসাধ্য সাধন করছে সন্দেহ নাই। কিন্তু প্রযুক্তির বলে মানুষের মঙ্গলে মহাকাশযান পাঠানোর গল্প কিংবা মস্তিস্ক প্রতিস্থাপনের কথা শুনে আমরা যতটা আপ্লুত হই, সার্জারি, হরমোনাল থেরাপি প্রভৃতির মাধ্যমে নারী থেকে পুরুষে বা পুরুষের নারীতে রূপান্তরের কাহিনীতে আমাদের ততটা আগ্রহ নেই। প্রযুক্তি যখন আমাদের বিশ্বাস ও মুল্যবোধের পরিবর্তন দাবী করে তখন আমরা পিছিয়ে যাই, যেকোনোভাবে সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চেষ্টা করি সঙ্ঘবদ্ধভাবে, কখনো সখনো সরকারি বদান্যতায়। কোপারনিকাস, গ্যালিলিও এরাও কিন্তু এভাবেই ফেঁসে গেছিলেন। সাম্প্রতিক যে সারোগেসি বিতর্ক, এর মূলেও রয়েছে এজাতীয় বিশ্বাস ভাঙার গল্প, মূল্যবোধ পরিবর্তনের বাধ্যতা। স্মরণাতীত কাল থেকেই মাতৃত্ব ব্যাপারটা ভীষণ সেনসিটিভ। একচুল এদিক ওদিক হওয়ার জো নেই। কোনো ঝাপসা ব্যাপার থাকলেই ডিএনএ টেস্টের ফরমান জারি করা হয়। এরকম একটি জাঁদরেল ধারনাকে প্রায় মস্করার পর্যায়ে নিয়ে চলে গেছে আইভিএফ প্রযুক্তি। বন্ধ্যাত্ব, ডিভোর্স, বিধবা, সিঙ্গল পেরেন্ট, লিভ-ইন সম্পর্ক সব ঘেঁটে ঘ। সারোগেসি শুধু মাতৃত্বের ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে না, আরো কিছু উটকো ধারণার জন্ম দেয়। বন্ধ্যা নারীর মা হওয়াটা এখন আর স্ববিরোধিতা নয় নির্বিরোধে শাপমোচন। শ্বশুরবাড়ির গঞ্জনা থেকে মুক্তি, স্বামীর উপেক্ষা থেকে মুক্তি, ভাগ্যের বিড়ম্বনা একনিমেষে ধাঁ। সুতরাং এরকম একটি কনসেপ্ট, শুধু কনসেপ্ট নয়, রীতিমতো প্রয়োগ যে সংরক্ষনশীলদের মাথাব্যথার কারন হবে- এ আর নতুন কী? তবে যেটা বলবার সেটা হল মাতৃত্বের সাথে গর্ভধারনকে ওতপ্রোতভাবে গুলিয়ে ফেলার অভ্যেসটুকু পরিত্যাগ করলেই সারোগেসি নিয়ে খুব নাক সিঁটকানোটা থাকবেনা। আরো ভালো করে বললে, যে মা হবে তাকেই গর্ভধারন করতে হবে এই বিধিবদ্ধ বাধ্যতাটুকু ছাড়তে হবে। ওই কয়েকমাসের গর্ভাধারনের কষ্টই কি একজনকে সত্যি সত্যি ‘মা’ করে তোলে। একটি সন্তানের বাকি জীবনটা (যতদিন মা বেঁচে থাকে) কি এমনিই উতরে যায়, কোনো আয়াস, কোনো পরিশ্রম ছাড়াই? মাতৃত্ব ব্যাপারটা কি এতই ঠুনকো। বাই ডিফল্ট মা হওয়া যায় না। গর্ভধারনেই যে মাতৃত্ব তা তো একপ্রকার বাধ্যতা, ওই যে বললাম বাই ডিফল্ট। বরং সন্তানের বড় হওয়ার সাথে সাথেই একজন নারী ক্রমশ মা হয়ে ওঠেন। মাতৃত্ব সত্তার একটি দিক, একরকমের ইমোশন, যেটা থাকলে একজন মানুষ সে নারীই হোক বা পুরুষই হোক, সন্তান লালনপালনে দক্ষ হয়ে ওঠে। এই সত্তা নিয়ে কেউ জন্মায় না। সন্তান জন্মের পর প্রয়োজনের তাগিদেই তার নির্মান শুরু হয়। সন্তানের বড় হওয়ার সাথে সাথেই এই নির্মান সম্পুর্নতার দিকে এগোয়। মেয়েরা কেউ জন্মসুত্রে মা হয়ে জন্মায় না। Biology is not Destiny. সে মা হয়ে ওঠে। এবং এই হয়ে ওঠার মধ্যে গর্ভধারন নিছকই একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কেউ যদি কোনোকারনে অক্ষম হয় তাহলে সে বিকল্প পথ বাছতেই পারে। একজন গর্ভধারনে অক্ষম সুতরাং  সে আর এ জন্মে মা হওয়ার সুযোগ পাবে না – এজাতীয় নিয়তি না থাকাই ভালো। সারোগেসি নিয়ে ছুঁৎমার্গতার একটা বড় কারন হিসেবে বলা হয় মাতৃত্ব একটা ভীষন পবিত্র সম্পর্ক। এর সাথে ব্যবসা জুড়ে গিয়ে মাতৃত্ব ব্যাপারটাকেই বাণিজ্যিক করে তুলেছে। এই পরিসরে একটি আপাত ফাজিল মন্তব্য করতে চাই। মাতৃত্বের সাথে চিরকালই বাণিজ্যের যোগ। সম্পত্তির ব্যাক্তিগত মালিকানা, উত্তরাধিকার এগুলি একরকমের বাণিজ্যই। প্রাচীনকালে রাজাদের সন্তানদের মধ্যে, তার মায়েদের মধ্যে এই উত্তরাধিকারের রাজনীতি যে ভীষণভাবে চলত এটা আমরা সকলেই জানি। ফলত মাতৃত্বের সাথে বাণিজ্যযোগ সম্পর্কটিকে কলুষিত করছে-এজাতীয় আক্ষেপ অর্থহীন। যারা সরাসরি কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে, বা যে জাতীয় কাজে শরীরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে – সেখানে আমরা শরীরটার জন্যই পয়সা দিই। সোজা কথায় শরীরটাই সেখানে ভাড়া খাটে। শারীরিক সক্ষমতা চলে গেলে ওই জাতীয় কাজ আর করা যায় না। সারোগেসির ক্ষেত্রেও একধরনের শারীরিক দক্ষতা অর্থের বিনিময়ে ব্যবহৃত হয়। সেই দক্ষতার সাথে মাতৃত্বকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। কেউ হাতের কাজ করে, কেউ পায়ের কাজ করে, আমার কেউ মাথা খাটিয়ে অর্থ উপার্জন করে। তেমনি নারী শরীরের মধ্যে থাকা জরায়ুরও একধরনের কাজ আছে। এবং সেই কাজ করে অর্থ উপার্জনও সম্ভব।