mother-1এত ভারি মুসকিল হল! শাহরুখ খান বা আমির খান গর্ভ ভাড়া নিয়ে সন্তান এনেছেন বলে তামাম দুনিয়ার মানুষ (পড়ুন রাজধানীর ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিকরা) সারোগেসির বিরুদ্ধে চলে গেলেন! মানে কি এর? তাহলে কি হবে সেই সব মেয়েদের যাঁরা স্বনির্ভর হোয়ার পর সন্তান চান? কিংবা সেই সব দম্পতির যাঁদের শারীরিক জটিলতার কারণে গর্ভ ভাড়া নেওয়া ছাড়া উপায় নেই? দেশের সরকারের বক্তব্য মায়েদের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সারোগেসির বিপুল ব্যবসায়িক দিকটিতে রাশ টানা। কিন্তু প্রশ্ন হল তাতে লাভ কার? সরকারের? নিঃসন্তান যুগলের? নাকি সেই মহিলার যিনি তাঁর অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা- ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্যে একমাত্র সম্বল ‘গর্ভ’ ভাড়া দিয়ে কিছু টাকার নির্ভরতা পাচ্ছিলেন?

অদিতি বসু রায়
অদিতি বসু রায়

২০০২ সালের আইন অনুযায়ী কিন্তু সারোগেসি এ দেশে লিগাল ছিল। হঠাৎ চলতি বছরে সরকার যে কেন বিষয়টিকে বেআইনি ঘোষণা করে দিলেন তার কারণ সত্যিই হাস্যকরই কেবল নয় অযৌক্তিকও বটে। আর প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস জানাচ্ছে এই প্রথা বহুকালের। মহাভারতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘নিয়োগ প্রথা’য় সন্তান-জন্ম এ-দেশে অন্তত নতুন কিছু নয়। যদিও সরকারের প্রধান যুক্তি বিষয়টিকে ব্যবসায়িক ভাবে স্বীকৃতি না দেওয়া! সেটাও অনেকটাই অমানবিক ব্যাপার বলেই ধরা যেতে পারে। সোনারপুরের প্রতিমা মন্ডলের কথা বলা যাক তাহলে! প্রতিমার বয়েস তেত্রিশ। স্বামী মারা গেছে বাস আক্সিডেন্টে। দুটি মেয়ে। একটি বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাক্ষিণ্যে একবার সে সারোগেট মাদার হওয়ার সুযোগ পায়। মেলে প্রায় তিন লাখ টাকা-সেবা যত্ন- পুষ্টিকর খাবারদাবার। প্রতিমার ডাক্তারি পরীক্ষায় জানা যায় সে যথেষ্ট ফিট ফলে সে আশায় বুক বেঁধেছিল মোটামুটি সুরক্ষিত একটি অর্থনৈ্তিক জীবন পাওয়ায়। এখন সে জেনেছে আর এই পেশায় সে থাকতে পারবে না। কেন না, এ নাকি এখন নিষিদ্ধ। প্রতিমা দিল্লির রাজনীতি বোঝে না- বোঝে না রাজনীতির চাপান-উতোর- সে প্রশ্ন করেছে “ আমি এবার  কি করে দুটো ভাত জোগাড় করব? তবে লাইনে কি নামবো দিদি?” এই প্রশ্নের সামনে নির্বাক মাথা নীচু করে থাকা ছাড়া সভ্যতা কিছু শেখায় নি আমাদের আজ পর্যন্ত।এবার চোখ রাখা যাক কি বলতে চাইছেন সরকার নতুন সারোগেসি বিল-এ! যে কয়েকটি ‘হার্ড অ্যান্ড ফার্স্ট’ রুল আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে সেগুলি হল- ব্যবসায়িক চুক্তিতে সারোগেসি বন্ধ করতে হবে, বিদেশিরা ভারতীয় সারোগেট মাদার নিতে পারবেন না, যেসব দম্পতি ইনফার্টিলিটির কারণে গর্ভ ভাড়া নিতে চান তাঁরাই একমাত্র আইনত সারোগেসির আওতায় আসতে পারবেন তবে এক্ষেত্রে  অতি অবশ্যই তাঁদের দাম্পত্যজীবনের মেয়াদ পাঁচ বছর বা তার বেশি হতে হবে এবং একই সঙ্গে হবু মায়ের বয়েস ২৩-৫০ ও বাবার বয়েস ২৬-৫৫-এর মধ্যে হওয়া বাধ্যতামূলক, সারোগেট মাকে কেবল তাঁর গর্ভাবস্থার যাবতীয় চিকিৎসার খরচ দেওয়া যাবে এছাড়া অন্য কোনও টাকা তাঁকে দেওয়া চলবে না, বাইরের কোন মহিলাকে সারোগেট মাদার হিসেবে নিয়োগ করা যাবে না কেবল পরিবারের কোনও নিকট সদস্যই এই কাজ করতে পারেন, একটি সন্তান থাকলে সারোগেসির পথে যাওয়া চলবে না। এতে সমস্যা যে আরও বাড়বে বই কমবে না, তা বলাই বাহুল্য। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে কোনও মহিলাকে সারোগেট মাদার হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য করা রীতিমত ভুল সিদ্ধান্ত। কেন না, একই পরিবারের মধ্যে এই রকম ইমোশ্যানাল বন্ডিং থাকাটা অস্বাস্থ্যকর এবং সন্তানটি ও তার বাবা-মায়ের প্রতিও ইন জাস্টিস। আর এমন তো হতে পারে, কোনও এক নিঃসন্তান দম্পতির কোনও এমন আত্মীয় নেই যিনি সারোগেট মাদার হতে পারেন- সেক্ষেত্রে কি করবেন তাঁরা?  কার দোষে তাঁরা সন্তানের অভিভাবকত্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন- নিজেদের ইনফার্টিলিটির নাকি সরকারের নীতির? কোনও প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না। যেমন উত্তর পাওয়া যায়নি প্রতিমা মন্ডলের জিজ্ঞাসার!