tagor‘২৫ শে  বৈশাখ’ দেখা দিক বার বার জন্মেরও  প্রথম ও শুভক্ষণ

— অরুণিমা সেন

“তুমি রবীন্দ্রনাথ
শুধু একটি নাম।”
নিখিল রঞ্জন দাসের এই দুটি লাইন আজ ও আমাদের রবীন্দ্র সাহিত্য গহ্বরে নিয়ে যায় বারে বারে যেখানে শুধু –
“ চিত্ত যেথা ভয় শূন্য উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত যেথা গৃহের প্রাচীর”।
বৈশাখের এই প্রচণ্ড দাবদাহে যখন চারিদিক অতিষ্ঠ তখন সূর্যদয়ের প্রথম আভা আমায় স্মরণ করিয়ে দেয় বৈশাখে “রবি” ঠাকুরের জন্ম দিবস ২৫ শে বৈশাখ। কেন জানি না তখন একটাই গান শুধু মনে আসে বারংবার –
“হে নূতন দেখা দিক বার বার জন্মের ও প্রথম ও শুভক্ষণ”।

সমগ্র বিশ্ব বাঙালিরদের মনে এই বৈশাখ মাসটি এক রোমাঞ্চকতা আনে। এই মাসে এমন একজন মহাত্মার জন্ম হয়েছিল, যাকে নিয়ে আজ ও আমরা গর্বিত এবং পৃথিবীর স্থায়িত্ব থাকাকালীন আমরা এই গর্বে গৌরবান্বিত হব। এই মহান মহাত্মাকে ছাড়া বাংলা সাহিত্য সত্যিই অসম্পূর্ণ। বাঙালিদের সাহিত্যের শুরু ও শেষ তাঁকে দিয়েই। আপামর বাঙালির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সমস্ত অনুভূতির সাথে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্র সাহিত্য। এই উক্তি টি আজ না স্মরণ করলেই নয় –
“ আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে”
আছো তুমি হৃদয় জূড়ে”।
মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে যার পথ চলা শুরু, ঘরের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ থেকে ও যার প্রাণ সদা উন্মুক্ত, যার অবিশ্রান্ত পরিশ্রম সাহিত্যের আণাচে কাণাচে ছড়িয়ে আছে সেই মানুষটিকে নিয়ে লেখা সত্যি বড় কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। তবু ও যতটুকু জানতে পেরেছি যা খুব ই নিতান্ত তা দিয়েই কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ১৫৫ তম জন্ম দিবসে আমার তোমার প্রতি ভালবাসা, সম্মান অর্পণ করলাম।
বাংলা সাহিত্য আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তার অন্যতম প্রধান কারন বিশ্ব বরেণ্য কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ। আধুনিক সাহিত্যের পথ প্রদর্শক ও তিনি। ছোটবেলা থেকেই তিনি চার দেওয়ালের মধ্যে শিক্ষা কে আবধ্য রাখতে চাননি। শিক্ষা যে সমাজের প্রতিটি পাতায় আছে তা তিনিই প্রথম সবার সচক্ষে আনেন। ছোটবেলায় আমি যে স্কুল এ পরতাম সেই বিদ্যালয়ে সারম্বর এর সাথে রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন হত। তাই এই উজাপটির সাথে আমার পরিচয় আনেকদিনের। আমার ভাললাগত গান শুনতে আর ওই নৃত্য দেখতে। যদিও তখন কিছুই বুঝতাম না যে আসলে রবীন্দ্রানাথ এর মানে কি। কিছুটা নিজের ইচ্ছার, কিচ্ছুটা মায়ের সাহায্যে রবীন্দ্রের সমুদ্রে ঝাঁপ দিলাম। বয়সের সাথে সাথে আমার ইচ্ছাও ক্রমশ বাড়তে লাগল কিন্তু এতই দুর্ভাগ্য যে সেই সমুদ্র সাতঁরে শেষ আর করা যাছে না। নেশা যেন ক্রমেই আমায় চারিদিক দিয়ে আচ্ছন্ন করতে লাগল।
স্কুল জীবনে অনেক অনুষ্ঠান এ অংশগ্রহণ করেছি। সে আবৃতিই হোক না কেন বা গান। সবই আমার কাছে যেন জীবনে বেছে থাকার রসদ জাগাত। আজও মনে আছে আমার প্রথম বলা ‘ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ আর তার প্রথম কটা লাইন-
‘আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রানের পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত ও পাখির গান।‘
আস্তে আস্তে সময়ের সাথে বেড়ে উঠেছি আমি। জানিনা সকালটা কীসে ঘুম ভাঙল, হয়ত মায়ের ডাকে। ঘুম ভাঙতেই দেখি ‘শেষের কবিতা’ সামনে রাখা। আর পারলাম না লোভ সামলাতে।  জানি অফিস বেরতে হবে তাও পাতা ওলটাতে লাগলাম আপন খেয়ালে। একবার শুধু কানে এল মায়ের বকুনি আর তারপর আমি রবীন্দ্র জগতে মুরছা গেলাম।
‘ওগো তুমি নিরুপম
হে ঐশ্বর্যবাথে
তোমারে যা দিয়েছিনু তা তোমারি দান,
গ্রহন করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।‘
মনে পরে গেল সেই সমস্ত দিনের কথা যখন আমরা বন্ধুরা মিলে রবীন্দ্র চর্চা করতাম রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝিল পাড়ে। যখন শাড়ি পরে জোড়াসাঁকোতে যেতাম রবীন্দ্র জয়ন্তী তে। যখন হলুদ শাড়ি তে রাঙ্গা হয়ে দোল খেলতাম। সত্যিই সেই সমস্ত দিন আজ ও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি না গেলে বোঝা যাবে না সেখানের কি মহিমা। অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি অনেক পুরস্কার স্বরুপ বইও জিতেছি। এই সব ভাবতে ভাবতে হটাৎ নেশা কাটতেই দেখলাম ঘড়ির কাঁটা ৯ টা পেরিয়ে গেছে। মা বাবাকে বলছে এমনি ভাবে চললে মেয়ে কে বিয়ে করবে?? আমি ভাবলাম আগে মাকে মানাই নাহলে শিওরে বিপদ। এটা বুঝলাম আজ র স্কুল হলো না। যাই হোক মায়ের কাছে যেতে যেতে হটাৎ মায়ের একটি কথায় চমকে উঠলাম। মা জোরেই বলে উঠল এই ‘রবি’ বারে ‘রবি’ ঠাকুরের জন্ম দিন তা হুস আছে?? আমার সত্যি কাজের চাপে মনে ছিল না তা। আর সঙ্গে সঙ্গে এও মনে পড়ে গেল আমার স্কুলের বাচ্ছাদের ও রবীন্দ্র জয়ন্তী র জন্য প্রস্তুত করতে হবে। পরে ওই দিনই আমার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণজ্ঞাপন বিভাগের বিজয় দার ফোন আসাতে জানতে পারলাম শনিবার জোড়াসাঁকোতে অনুষ্ঠান রয়েছে আর সেখানে আমার যাবার নিমন্ত্রন ও আছে। শুনে মনটা আনন্দে নেচে উঠল আর আমি গুনগুনিয়ে উঠলাম-
“ আজি হতে শতবর্ষ-পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতুহল ভরে—
আজি হতে শতবর্ষ-পরে”।