তুষ্টি ভট্টাচার্য
তুষ্টি ভট্টাচার্য

পরকীয়া শব্দটা শুনলেই আমি বাঁশি দেখতে পাই। একটা সাদামাটা বাঁশি যেন ফুঁ দিলেই বেজে উঠবে। কখন সেই মহান প্রেমিক এসে বাঁশিতে সুর তুলবে আর রাধার তখন ‘আউলানো রন্ধন’ নিয়ে হিমশিম অবস্থা হবে! এবার রাধা পায়ে পায়ে ছুটে চলবে যমুনার দিকে, বাঁশির সুর লক্ষ্য করে। বাঁশি কি রাধার এই ছুটে আসার কথা জানতে পারে? তার বেজে ওঠার কি সেটাই উদ্দ্যেশ্য? নাকি সে আপন খেয়ালে বাজে, সুর এসে বাজালে বাজে? বাঁশি যখন পড়ে থাকে চুপচাপ, নেহাত একটি বাঁশের টুকরো ছাড়া সে তো আর কিছু নয়। বাঁশ থেকে বাঁশি বানাতে গেলে শুধু ঠিকঠাক ফুঁ দিতে জানতে হয়।

বাঁশি কে বাজায়? নাকি বাঁশি নিজে নিজেই বাজে? এই দ্বিধা নিয়ে একবার বাঁশিবাদকের দিকে তাকাই আর একবার বাঁশির দিকে। মনে হয় বাদকই সব, সেই তো সুরের কারিগর। আবার মনে হয়, এই বাঁশিটি যদি না থাকত, তবে সে ফুঁ দিত কিসে! পরে বুঝি, একে অন্যের পরিপূরক। ঠিক যেমন এক পরকীয়ায় দুজন মানুষ এক অপ্রতিরোধ্য টানে একে অপরের দিকে ছুটে আসে। আর ছুটে আসাটা যে অনিবার্য, তা তারা আগেই জেনে যায়। কারণ ততদিনে তারা বুঝে যায়, একের অন্যকে ছাড়া আর উপায় নেই। এই টানের প্রধান অনুষঙ্গ অবশ্যই শরীর। সঙ্গে থাকে একে অন্যকে মুখে কিছু না বলেও বুঝে নেওয়ার প্রবণতা, যা এই সম্পর্কের স্থায়ীত্বের সব থেকে বড় বিচার্য উপাদান। এ হল সেই সুর, যা একে অন্যকে দোলায়, ভাসায়। আবার এই বাঁশি যেহেতু লিঙ্গের প্রতীক, অর্থাৎ প্রেমের, কামের প্রতীক, তাই প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে কাম জেগে উঠবে, প্রেম আর কামের মহামিলনে যে সুর বেজে উঠবে, সেই সুর বাঁশিই পারে বাজাতে। বাঁশি তখন আপনাআপনিই বেজে উঠবে। পরকীয়ার মধুর সুরটি বেজে উঠবে। তখন মন কোন পাপবোধে আক্রান্ত হবে না, পাপ তাদের পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করতে পারবে না। ক্ষমাসুন্দর মন ভরে উঠবে এক অজানা ব্যথায়। এই সম্পর্কে তো একে অন্যকে পুরোপুরি বা সব সময়ের জন্য পাওয়ার উপায় থাকে না, তাই যেটুকু পাওয়া যায়, তাই অনেক গুণ হয়ে ফেরৎ আসে। আর যে সুতীব্র না-পাওয়া থেকে গেল, মন বিষাদে ভরে গেল, ব্যথায় গলে গেল – যে ব্যথা যন্ত্রণা দেবে না, শুধু মনটাকে দ্রব করে রাখবে এক ভেজা অনুভূতির ভেতরে। যেন একটা বীজ নরম মাটিতে পোঁতা হল। পরের দিন আলো পেলে অঙ্কুরিত হয়ে নতুন চারার জন্ম হবে। ‘এ ব্যথা কী যে ব্যথা, বোঝে কী আন জনে’! বুঝবে তারাই, যারা পরকীয়ায় জড়িয়েছে। কিন্তু এই যে বাঁশি সুরে বেজে উঠল বলে এত অনুভূতির জন্ম হল, সেই বাঁশির সুর সত্যি না মিথ্যে? মনে হয়, রোজকার ঘটনার ওপর যেন একটা স্বচ্ছ পর্দা ফেলে দিয়ে কেউ চলে গেছে, পর্দার আড়াল থেকে সেই বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করা গেলেও, মন যেন তার বাইরে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যিকেও আর ততটা কঠোর সত্যি মনে হচ্ছে না, মিথ্যেকেও ততটা কদর্য লাগছে না। ঠিক যেভাবে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন —
“ বাঁশির বাণী চিরদিনের বাণী-শিবের জটা থেকে গঙ্গার ধারা, প্রতি দিনের মাটির বুক বেয়ে চলেছে; অমরাবতীর শিশু নেমে এল মর্তের ধূলি দিয়ে স্বর্গ-স্বর্গ খেলতে।
পথের ধারে দাঁড়িয়ে বাঁশি শুনি আর মন যে কেমন করে বুঝতে পারি নে। সেই ব্যথাকে চেনা সুখদুঃখের সঙ্গে মেলাতে যাই, মেলে না। দেখি, চেনা হাসির চেয়ে উজ্জ্বল, চেনা চোখের জলের চেয়ে সে গভীর।
আর, মনে হতে থাকে, চেনাটা সত্য নয়, অচেনাই সত্য। মন এমন সৃষ্টিছাড়া ভাব ভাবে কী করে। কথায় তার কোনো জবাব নেই।
আজ ভোরবেলাতেই উঠে শুনি, বিয়েবাড়িতে বাঁশি বাজছে।
বিয়ের এই প্রথম দিনের সুরের সঙ্গে প্রতি দিনের সুরের মিল কোথায়। গোপন অতৃপ্তি, গভীর নৈরাশ্য; অবহেলা, অপমান, অবসাদ; তুচ্ছ কামনার কার্পণ্য, কুশ্রী নীরসতার কলহ, ক্ষমাহীন ক্ষুদ্রতার সংঘাত, অভ্যস্ত জীবনযাত্রার ধূলিলিপ্ত দারিদ্র্য-বাঁশির দৈববাণীতে এ-সব বার্তার আভাস কোথায়।
গানের সুর সংসারের উপর থেকে এই-সমস্ত চেনা কথার পর্দা এক টানে ছিঁড়ে ফেলে দিলে। চিরদিনকার বর-কনের শুভদৃষ্টি হচ্ছে কোন্‌ রক্তাংশুকের সলজ্জ অবগুন্ঠনতলে, তাই তার তানে তানে প্রকাশ হয়ে পড়ল। যখন সেখানকার মালাবদলের গান বাঁশিতে বেজে উঠল তখন এখানকার এই কনেটির দিকে চেয়ে দেখলেম; তার গলায় সোনার হার, তার পায়ে দুগাছি মল, সে যেন কান্নার সরোবরে আনন্দের পদ্মটির উপরে দাঁড়িয়ে।
সুরের ভিতর দিয়ে তাকে সংসারের মানুষ ব’লে আর চেনা গেল না। সেই চেনা ঘরের মেয়ে অচিন ঘরের বউ হয়ে দেখা দিলে।
বাঁশি বলে, এই কথাই সত্য।“

‘মধুর মধুর বংশী বাজে কোথা কোন কদম তলীতে’- পরকীয়ার কান অধীর হয়ে থাকে এই গান শোনার জন্য। মন অবুঝ হয়ে থাকে, ফলে অতি অল্প পাওয়া যে মধুরতা, যাতে মন ঠিক ভরে না, অধৈর্য হয়ে পড়ে। একে অন্যকে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। এক পক্ষের মনে হয়, অন্য পক্ষ অবহেলা করছে, অন্য পক্ষের মনে হয় ও উপেক্ষা করছে। সম্পর্কে ফাটল ধরে কখনও, কখনও বা সাময়িক বিচ্ছেদ, কখনও বিচ্ছেদ চিরস্থায়ী। আসলে এই ধরণের যে কোন সম্পর্কেই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে একটা অস্থিরতা আসতে বাধ্য। শেষমেশ আচমকাই দুটো মন ভেঙে যায়। তখন আর ফেরার উপায় থাকে না। হাত পা ছড়িয়ে কাঁদাও যায় না, নিঃশব্দে চোখের জল গিলে নিতে হয় লোকের আড়ালে। আর মনের শিশুটি হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে থাকে, ঠিক যেন তার খেলনা ভেঙে গেছে। পরকীয়ার বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। এ কথা জেনেও মানুষ পরকীয়ার আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারে না। অনেক সময় ঘর ভাঙে, মান সম্মান খোয়ায় এর জেরে। তখন মনে হয়, ও তো বাঁশি না সাক্ষাৎ বংশদন্ড। কী ভুলই না করেছি! আর ওই পথে যাব না কোনদিন। পরকীয়ার খুরে খুরে নমস্কার। বেশ ছিলাম বাবা, নিজের সংসার নিয়ে। নাহয় মিলমিশ একটু কম ছিল, নাহয় বড় একঘেয়েই ছিল, তবু অশান্তি তো ছিল না। বুক চিরে ফালাফালা করে দেয় নি তো কেউ! আমার বউটা বড্ড ভাল, ওকে কত কষ্ট দিলাম! আমার বরটা কত উদার! ওকে কত ঠকালাম! পাপবোধে মন কুঁকড়ে থাকে কিছুদিন। অথচ কিছুদিন আগেই যখন পরকীয়ার তুরীয় অবস্থা চলছে, তখন কিন্তু এই বউ বা বরের সঙ্গে শুয়ে অন্যকে চোখ বুজে ভেবে নেওয়া অবধারিত ছিল! নাহলে শরীর জাগত না যে! বিচ্ছেদের পরে যন্ত্রণা বোধটা একটু কমলে একটা প্রশান্তি আসে। মনে হয়, যাক বাবা, বাঁচা গেল এই ঝঞ্ঝাট মুক্ত হয়ে! এই রকম জায়গায় এসে, তবেই কিছুদিন পরকীয়াকে ভুলে থাকা গেল।
তবে ভবি কী আর ভুলবার! কোন না কোন ভবা আর কোন না কোন ভবি দুজনেই আবার পরকীয়ায় জড়িয়ে যায়। আবারও সেই মধুর মধুর বংশী ধ্বনী, আবারও সেই টানাপোড়েন, চোখের জল, ইত্যাদি। ভবা আর ভবির একেক সময়ে মনে হয়, এ তো প্রেম নয়, এ যে কেবলই চোখের জল, এ যে কেবলই দুখের শ্বাস। তবে একদম আধুনিক ছোকরা ভবা আর ছুকরি ভবিদের পরকীয়া নিয়ে আর কোন টেনশন নেই দেখেছি। আছ তো ভাল, গেলেও ক্ষতি নেই টাইপের হাবভাব। ফলে পরকীয়ার গভীরতা কমছে, প্রেম কমছে। শুধু যেন কিছুটা ভিন্ন স্বাদের সময় কাটানো, ভিন্ন স্বাদের শরীর আস্বাদন, এই হয়ে গেছে পরকীয়ার মুখ্য আকর্ষণ। সেই আকুল রাধা আর নেই, সেই ব্যাকুল কৃষ্ণই বা কোথায়! ফলে বাঁশির সুর আর শোনা যায় না তেমন ভাবে। বাঁশি পড়ে আছে, বাদকও আছে, ফুঁ নেই, ফুঁ হারিয়ে গেছে।
পরকীয়া তুমি কার? তুমি কি আমার হবে? আমার মত করে আমার নিজস্ব কেউ? আমি জানি পরকীয়া কারুর হয় না। সে নিজে নিজের কাছেই অধরা হয়ে থাকতে চায়। পরকীয়া পর, আপন নয়, এটা মেনে নিলে আমাদের আর কোন সমস্যা থাকবে না। অথচ মেনে নেওয়া যায় না। সেই যে বাঁশি, সেই ভুল ভাবায়। আত্ম ভুলে পর করে দেয় নিজেকে। নিজের কাছে যদি নিজের আত্মা না থাকে, অন্যের কাছে গচ্ছিত রাখতে ইচ্ছে হয়, তখন সে আত্মা নিজের কাছে থেকেও যেন পর হয়ে যায়। আর তাই বুঝি পরকীয়ার এত আকর্ষণ। সেই আদি কাল থেকে এখনও পর্যন্ত এর আকর্ষণ একটুও কমে নি, বরং সুযোগ সুবিধে বাড়ার ফলে পরকীয়ার পৌষমাস এসে গেছে। আর সর্বনাশও এসেছে পিছু পিছু। কেউ কারুর চোখে সর্বনাশ দেখেছে, কেউ আবার ভাঙনের মুখে পড়ে সর্বনাশের স্বীকার হয়েছে।