সুমন গুণ
সুমন গুণ

বিশ্ববিশ্রুত পরিচালক হিচককের ‘রিয়ার উইন্ডো’ আমার নিজের সবচেয়ে পছন্দের ছবিগুলোর একটি। এই একটি ছবিতে জীবনের বিচিত্র মন্তাজের দিকে ছড়িয়ে তাকাতে পেরেছেন হিচকক। নিজেকে আড়ালে রেখে জীবনযাপনময় কয়েকটি বাড়ির নানা জানালায়, অলিন্দে, চবুতরের দিকে তাকিয়ে বুঁদ হয়ে আছে আহত একটি মানুষ, তাঁর গোপন জানালা দিয়ে, পরতে পরতে তার সামনে খুলে যাচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার নানা ভাঁজ, ভঙ্গি ও বিস্ময়। আমাদের জীবন তো এমনই, নানা চরিত্রের বিচিত্র আলোছায়ায় ভরা।
এই আলোছায়াময় জীবনের স্বাদ নেবার সবচেয়ে বিতর্কিত কিন্তু স্বাদু উপায়টি হলো পরকীয়া। পরকীয়া যে-কোনও স্বাভাবিক মানুষের একটি রোমাঞ্চময় আশ্রয়। কেউ সেই আশ্রয় সাদরে বরণ করেন, নিজেকে নানা উপায়ে তার মধ্যে ডুবিয়ে দেন। উপায়গুলো সবই যে খুব সংগত তা অবশ্যই নয়, কিন্তু আমরা জীবনে সব কিছু তো মেপে করতে পারি না। আমাদের ভুল হয়, কিছু ভুল স্বেচ্ছায়, কিছু না বুঝে বা জেনে। কিন্তু ঠিক-ভুলের এই ব্যাকরণহীন কাঠামোটিই আমাদের জীবন। এই কথাটিই লিখেছিলাম একবার, একটি কবিতায় :

এই জীবনের মধ্যে ছোটো বড়ো
অনেকগুলি স্টেশন রয়েছে, নানা কাজে
সেখানে আরও অন্য জীবনের মানুষ, রোজই
আসে, থামে, কিছুক্ষণ অকারণে বসে, চলে যায়। কেউ কেউ
কোনওদিন আর হয়ত ফিরেও আসে না
তাদের সবাইকে নিয়ে, আমাদের
জীবনের বৃত্ত তৈরি হয়, আর আমরা সবাই
এই বৃত্তটিকে ছুঁয়ে আছি, গড়ে তুলছি, মাঝে মাঝে
ভুল করে ভেঙেও ফেলছি

ভাঙা ও গড়ার এই সমাজসম্মত আয়তনে
প্রতিদিন ভোর হয়, সূর্যাস্তের আলো এসে পড়ে।

আসলে, কোনও একজনের সঙ্গে একই বিছানায়, একই ছাদের নীচে, একই উদ্দেশ্যে দিনের-পর-দিন নির্বিকারভাবে কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে-নির্মমতা আছে, অপমান আছে, তাকে অস্বীকার করাই পরকীয়া। এটা মেনে নেওয়া জরুরি। তাহলে আমাদের জীবনের অনেক বিপর্যয় কমে যায়, জীবন আরও নিরাপদ হয়, সহজ হয়, স্বাভাবিক হয়। সম্পর্ক পুরনো হয়ে এলে, ক্রমশ, ফুরিয়ে আসে আহ্লাদ, ক্রমশ, নদীর কিনার থেকে নৌকো আরও দূরে সরে যায়। প্রথম প্রথম কথায় জড়িয়ে থাকে মেঘ, আর মেঘের ছায়ায় চারপাশ ঘন হয়ে আসে, দূরে দূরে চোখে পড়ে গ্রামের দুর্লভ সীমা, উচ্ছ্বসিত গাছ, গতির উৎসাহে সব সাজানো রয়েছে মনে হয়। যত কাছে আসে, টের পাওয়া যায়, সব ছবি অনেক আগের চেনা, অভিমতহীন, ধার থেকে কমে যাচ্ছে ফ্রেমের জৌলুশ, রঙ মুছে গেছে, এমনকি, হাতে নিয়ে দেখারও আগ্রহ ধসে যায়।
প্রতিটি সম্পর্ক তাই প্রাথমিকভাবে সাবলীল। শুরুর বৈভব ক্রমশ হারিয়ে যায়, ভাঁজে ভাঁজে চোখে পড়ে লুকনো ময়লা, যে-আওয়াজ আশ্রয়ের মত মনে হতো, তা শুধু চিৎকার হয়ে বাজে, প্রতিদিন ধ্বনির তৈজস কমে আসে।
তাই, মনে হয়, সম্পর্ক দূরের থেকে রক্ষা করা ভালো। দূরের লালন নিঃশব্দে বাঁচিয়ে রাখে সব সম্ভাবনা, দূরের আতিথ্যে বেঁচে থাকে যমক, অনুপ্রাস, শ্লেষ।
তবে, এটাও হয়ত ঠিক, যে, কাছের লালন থেকে, মনে হয়, খুঁজে নেওয়া যায় শুদ্ধস্বর, পটমঞ্জরীর জটিল লাবণ্য দিয়ে গড়ে ওঠে যেভাবে কাহ্নর ধ্রুবপদ, ধাপে ধাপে, ভেতরের দিকে, সেভাবেই অল্প অল্প আয়োজন নিয়ে নিজেকে উহ্য রেখে হয়ত বাঁচানো যায় বিপদসংকুল সান্নিধ্যের আঁচ। আমার এক নবীন বান্ধবী তার ব্যক্তিগত জীবনের ছাঁদ ভেঙে ভেঙে আমাকে দেখিয়েছিল, বোঝাতে চেয়েছিল কীভাবে কল্পনা দিয়ে, মন দিয়ে, শান্ত ভাবে, সাবলীলভাবে সম্পর্ক নতুনতর করে তোলা যায় দিন দিন।
এটা একটা দিক। তবে সবসময় এটা সম্ভব হয় না। আর তখনই পরকীয়ার আহ্বান আসে। আমার একটি স্বীকারোক্তিমুলক কবিতা দিয়ে এই লেখা শেষ করছি :

টানা কথা বলে যাওয়া, সঙ্গে থাকা, যোগাযোগ রাখা
প্রতিদিন সময় করে ফোনে কিংবা মেসেজে খবর
দেয়ানেয়া, খুঁটিনাটি সব কিছু আনুগত্যময়
উদ্যমে শোনানো, শুধু লেগে থাকা, ধরে রাখা, বছর বছর
এক রমণীর সঙ্গে এক রঙ, এক মাংস, এক সূর্যোদয় নিয়ে
নির্বিকার আসঙ্গবিলাস
আমার পক্ষে , না মেনে উপায় নেই সত্যি অসম্ভব।